তিন মাসের অক্লান্ত পরিশ্রমে দেশীয় কাঁচামাল দিয়ে ক্রায়ো এক্সট্রাক্টর মেশিন আবিষ্কার করেন স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত চক্ষু চিকিৎসক বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ডা. একেএমএ মুকতাদির। এ যন্ত্রসহ তার আবিষ্কৃত চক্ষু চিকিৎসার ব্যবহৃত ১৩টি যন্ত্র উদ্ভাবনের ৪৫ বছর পর সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করেছেন তিনি। এগুলো রয়েছে ডা. মুকতাদির স্মৃতি জাদুঘরে।
এর অবস্থান ময়মনসিংহের গৌরীপুরে। এর সামনে প্রতিদিন কৌতূহলী মানুষের ভিড় লক্ষ করা যায়। এটি প্রতিষ্ঠা করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ডা. একেএমএ মুকতাদির।
ডা. মুকতাদিরের তৈরি যন্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে-অপথালমোস্কাপ, রেটিনোস্কোপ, ডিসিআর বোন ট্রিফাইন, কেপ্নটোপ্লাস্টি করনিয়াল ট্রিফাইন, হ্যান্ড হেল্ড সাইনোপটোফোর, পাংটাম ডাইলেটর, ল্যাক্রিমাল গ্রোব, রিভলজি ডিশন চার্ট, ট্রায়াল ফ্রেম, আইপিডি মাপার যন্ত্র। এসব যন্ত্র উদ্ভাবন করেন ১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালে। ক্রায়ো এক্সট্রাক্টর যন্ত্রটি ১৯৬২ সালে ডা. চারিস ক্যালমেন প্রথম আবিষ্কার করেন। তখন এর দাম ছিল ৬ লাখ টাকা, যা এ দেশের চিকিৎসকদের ক্রয় ও ব্যবহার ছিল অসম্ভব।
এ প্রসঙ্গে ডা. মুকতাদির বলেন, আমি সেই যন্ত্রটি দেখলাম, ব্যবহার করলাম। পরে ৩ মাসের পরিশ্রমে সেই যন্ত্রটি তৈরি করি. যা তরুণ ডাক্তাররা মাত্র এক হাজার টাকায় ক্রয় করতে সক্ষম হন। সেটি ছিল ১৯৭৯ সাল। যন্ত্রটি তখন পেটেন্ট করি। প্রযুক্তিটি ১৯৮৩ সালে জার্মানির সিমেন্স কোম্পানির কাছে বিক্রি করি। এতে বিভিন্ন দেশের চক্ষু চিকিৎসকরা উপকৃত হন। এ জাদুঘরে ডা. মুকতাদিরের আবিষ্কৃত যন্ত্র এবং তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র রয়েছে।
জাদুঘরে দর্শনার্থীদের স্বাগত জানানো হয় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের ‘হুঁকা ও পানদানি’ দিয়ে। রয়েছে নানা সময়ে তার ব্যবহৃত চশমা, মোমদানি, হারিকেন, কুপিবাতি, কলেরগান (গ্রামোফোন), হেজাকবাতি, কেরোসিন স্টোব, ম্যাগনেটো টেলিফোন সেট, মারফি রেডিও, নতুন মারফি রেডিও, টেপ রেকর্ডার, হারমোনিয়াম, কাঠের হাওয়াইয়ান গিটার, ইলেকট্রিক হাওয়াইন গিটার, ইলেকট্রিক গিটার এমপ্লিফায়ার, ইকোবক্স ও প্রতিধ্বনি যন্ত্র, তবলা, টেলিফোন, ফ্যাক্স মেশিন, ট্রানজেস্টার ও কেসেটপ্লেয়ার, হস্তচালিত টাইপ রাইটার, ইলেকট্রিক টাইপ রাইটার, ভিসিআর ও ক্যাসেট, স্লাইড প্রজেক্টর, ফিল্মচালিত ক্যামেরা, ফিল্মচালিত ভিডিও ক্যামেরা, তারবিহীন ইন্টারকম, অপারেটিং ম্যাগনিফাইং গ্লাস, দেশের জাতীয় পশু, পাখি, ফুল, ফল ও মাছের প্রতিকৃতি, মালদ্বীপ থেকে সংগ্রহকৃত জিনিসপত্র, রেডিয়াল কেরাটোটমি, দেওয়াল ঘড়ি, কয়লার ইস্ত্রি, মাপার ট্যাপ, কীবোর্ড, ঢোল, মৃত হরিণের চামড়া, রুপার প্লেট, সুট, সিলভারে তৈরি ট্রে, পিতলের তৈরি ধোপদানি, খেলনা জিনিসপত্র।
এছাড়া রয়েছে ৪৭ বছরের প্রকাশিত সংবাদপত্রের কাটিং। এর মধ্যে দৈনিক যুগান্তরের বিশেষ প্রতিবেদনসহ ১৯টি সংবাদ স্থান পেয়েছে। সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে স্বাধীনতা পদক। জাদুঘরে রয়েছে টার্কিশ লিরা, শ্রীলংকার রুপি, অস্ট্রিয়ান সিলিং, কম্বেডিয়ান রিয়েল, সুইডিশ ক্রোনা, ভিয়েতনামিজ ডং, হংকং ডলার, পোলিশ মলোটি, কানাডিয়ান ডলারসহ ৬২টি দেশের মুদ্রা।
ডা. মুকতাদির ও তার সহধর্মিণী ডা. মাহমুদা খাতুনের সহযোগিতায় ২০০৪ সালে নিজ গ্রাম নয়াপাড়ায় ডা. মুকতাদির চক্ষু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। চক্ষু চিকিৎসা ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ডা. মুকতাদির ২০১৪ সালে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ অ্যাওয়ার্ড, ২০০২ সালে লায়ন্স এফ্রিসিওয়ান অ্যাওয়ার্ড, ২০০৫ সালে এএফএও কর্তৃক ডিসটিংগোয়িং সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড, একেদাস অ্যান্ডওমেন্ট অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। এছাড়া তিনি ২০১৫ সালে ভারতে গোল্ড মেডেলসহ দেশ-বিদেশের ১৯টি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন।
চিকিৎসায় বিশেষ অবদানের জন্য ডা. মুকতাদিরকে ২০২০ সালে স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হয়। গ্রামীণ এলাকায় চোখের চিকিৎসায় অসামান্য অবদানের জন্য ভারতের বিলাসপুরে ২০২৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া অফথালমোজিক্যাল সোসাইটি (AIOS)-এর সম্মেলনে তাকে সম্মাননা জানানো হয়। ২০১৬ সালের ২২ অক্টোর ভারতের তিরুচিরাপল্লীতে অ্যাসোসিয়েশন অফ কমিউনিটি অফথ্যালমলোজি ইন ইন্ডিয়া আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাকে লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়।
মন্তব্য করুন