কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্য ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে অংশ নেওয়ার বিষয়টি শুধু একটি বহুপক্ষীয় বৈঠকে উপস্থিত থাকার প্রশ্ন নয়। কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে এবং এ বিষয়ে সদস্যদেশগুলোর সমর্থনও চেয়েছে। চীন ও রাশিয়া বাংলাদেশের সদস্যপদের প্রতি সমর্থনের কথা জানিয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকের সম্ভাবনাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ২০২৩ সাল থেকে নিয়মিতভাবে ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে আমন্ত্রণ পেয়ে আসছে। ২০২৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ এবং ২০২৪ সালে রাশিয়ার কাজানে অনুষ্ঠিত ব্রিকস আউটরিচে বাংলাদেশ অংশ নেয়। তবে ২০২৫ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত আউটরিচ পর্বে বাংলাদেশ অংশ নেয়নি।
দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এবারের শীর্ষ সম্মেলনে ব্রিকসভুক্ত অধিকাংশ দেশের শীর্ষ নেতার অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে বহুপক্ষীয় এই ফোরামের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন, রাশিয়াসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য হতে আগ্রহী। সে বিবেচনায় আউটরিচ পর্বে প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে এটি নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে সম্ভাব্য প্রথম বৈঠকের সুযোগও তৈরি করতে পারে। বহুপক্ষীয় এই ফোরামের সুযোগ বাংলাদেশের কাজে লাগানো উচিত বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়, পর্যবেক্ষক হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ফলে সরকারের পর্যায়ে সিদ্ধান্ত আসবে, প্রধানমন্ত্রী যাবেন কি না। গেলে অনেকের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার সুযোগ থাকে। তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, আমন্ত্রণপত্রে নরেন্দ্র মোদি উল্লেখ করেন, ব্রিকস প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এবারের শীর্ষ সম্মেলন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ‘সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আয়োজিত এ সম্মেলনে জনগণকেন্দ্রিক উন্নয়ন এবং ‘মানবতাই সবার আগে’ নীতির আলোকে সহযোগিতা জোরদারের উপায় নিয়ে আলোচনা হবে। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ সমসাময়িক বিষয়েও মতবিনিময়ের সুযোগ থাকবে।
বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে তারেক রহমানের অংশগ্রহণ ‘ব্রিকস আউটরিচ’ পর্বের আলোচনাকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে আশা প্রকাশ করেন নরেন্দ্র মোদি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়ের আগ্রহও ব্যক্ত করেন।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে বাংলাদেশ বিমসটেকের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে।
গতকাল সচিবালয়ে সরকারের কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচে বাংলাদেশ অংশ নেবে কি না—সেই প্রশ্ন করা হয়। জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য নয়, পর্যবেক্ষক হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। ফলে সরকারের পর্যায়ে সিদ্ধান্ত আসবে, প্রধানমন্ত্রী যাবেন কি না। গেলে অনেকের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার সুযোগ থাকে। তবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ নিয়ে প্রাথমিক কথাবার্তা শুরু হয়েছে বলেও তাঁর জানা নেই।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক যে গতিতে এগোনোর প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবে তা দেখা যায়নি। এমন প্রেক্ষাপটে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন দুই প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। ভারতও সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে আগ্রহী।
এম হুমায়ুন কবীর, সভাপতি, বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই)
সম্পর্কে অস্বস্তি তবু আলোচনার সুযোগ
বাংলাদেশের সাবেক ও বর্তমান একাধিক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের মতে, ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে জনপরিসরে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, তাতে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। তাঁদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দুই দেশের সম্পর্ককে বাংলাদেশের একটি বড় অংশ জনগণকেন্দ্রিক বলে মনে করেনি। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ইতিবাচক অগ্রগতির যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে তারও তেমন প্রতিফলন দেখা যায়নি। সীমান্তে ভারতের পুশ-ইনের অব্যাহত চেষ্টা, বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক নেতাদের বিভিন্ন মন্তব্য এবং সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফিরে রাজনীতি করার ইচ্ছা প্রকাশ—সব মিলিয়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অগ্রগতি নিয়ে সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বলে কূটনৈতিক মহলের ধারণা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যে ধারায় এগিয়েছে, নির্বাচনের পরও তা অব্যাহত রয়েছে। এ কারণে ব্রিকসের আউটরিচ পর্বে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের প্রশ্নে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও সরকারের বিবেচনায় থাকতে পারে। একই সঙ্গে নয়াদিল্লিতে শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে বৈঠকের সুযোগ তৈরি হলে, দেশের রাজনৈতিক ও জনমতের প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি কেমন হতে পারে, সেটিও সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে পারে বলে তাঁদের ধারণা।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি এম হুমায়ুন কবীর প্রথম আলোকে বলেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক যে গতিতে এগোনোর প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবে তা দেখা যায়নি। তাঁর মতে, এমন প্রেক্ষাপটে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন দুই প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বৈঠকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। ভারতও সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে আগ্রহী।
মন্তব্য করুন