মুক্তাগাছার মণ্ডা ও নেত্রকোণার বালিশ মিষ্টি—দুটিই ময়মনসিংহ বিভাগের বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি। তবে দুটির উৎপত্তি ও ইতিহাস আলাদা।
মুক্তাগাছার মণ্ডার ইতিহাস
মুক্তাগাছার মণ্ডার ইতিহাস প্রায় দুইশ বছরের পুরোনো। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৮২৪ সালে মুক্তাগাছার তারাটী গ্রামের মিষ্টি কারিগর গোপাল পাল প্রথম মণ্ডা তৈরি করেন। মুক্তাগাছা উপজেলা প্রশাসনের তথ্যেও ১৮২৪ সালকে মণ্ডা তৈরির সূচনাকাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কথিত আছে, গোপাল পাল মণ্ডা তৈরি করে তৎকালীন মুক্তাগাছার জমিদার সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর কাছে উপস্থাপন করেন। মণ্ডার স্বাদে জমিদার এতটাই সন্তুষ্ট হন যে জমিদারবাড়ির বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও আপ্যায়নে মণ্ডার বিশেষ স্থান তৈরি হয়।
মণ্ডা মূলত ছানা ও চিনি দিয়ে তৈরি এক ধরনের নরম, দানাদার মিষ্টি। এর বিশেষত্ব হলো—সাধারণ রসালো মিষ্টির মতো এতে প্রচুর সিরা থাকে না; বরং দুধের ছানার নিজস্ব স্বাদ ও মিষ্টতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সময়ের সঙ্গে মণ্ডা শুধু জমিদারবাড়ির মিষ্টি না থেকে মুক্তাগাছার পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। আজও ঐতিহ্যবাহী মণ্ডার সঙ্গে গোপাল পালের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বর্তমানে মুক্তাগাছায় ঐতিহ্যবাহী মণ্ডার জন্য পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হলো ।
নেত্রকোণার বালিশন তৈরি হয় মূলেকটি বড় বালিশ মিষ্ট মিষ্টির ইতিহাস
নেত্রকোণার বালিশ মিষ্টি তুলনামূলকভাবে প্রায় এক শতাব্দীর বেশি পুরোনো। প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, নেত্রকোণা শহরের বারহাট্টা রোড এলাকার মিষ্টি কারিগর গয়ানাথ ঘোষ এই মিষ্টি তৈরি করে জনপ্রিয় করে তোলেন।
মিষ্টিটির আকৃতি অনেকটা কোল-বালিশের মতো, তাই পরে এর নাম হয় ‘বালিশ মিষ্টি’। গয়ানাথ নিজে নামটি নির্ধারণ করেছিলেন কি না—এ নিয়ে বিভিন্ন বর্ণনা আছে; একটি প্রচলিত কাহিনিতে বলা হয়, স্থানীয় ব্যক্তিত্ব আবদুস সালাম পেয়ার মিয়া বালিশের মতো আকৃতি দেখে নামটি দেন।
বালিশ মিষ্টি তৈরি হয় মূলত দুধের ছানা, ময়দা ও চিনি দিয়ে। ছানা ও ময়দা দিয়ে মণ্ড তৈরি করে বালিশের আকৃতি দেওয়া হয়। এরপর সেটি চিনির সিরায় ভেজানো হয় এবং পরিবেশনের আগে ওপরে ঘন ক্ষীর বা দুধের মালাইয়ের প্রলেপ দেওয়া হয়।
একেকটি বড় বালিশ মিষ্টির ওজন এক কেজি বা তারও বেশি হতে পারে। বিশেষ করে বিয়ে, গায়েহলুদ, জন্মদিন, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা নতুন জামাইয়ের শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় এই মিষ্টি নিয়ে যাওয়া নেত্রকোণায় একটি সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়েছে।
এই মিষ্টি ‘গয়ানাথের বালিশ’ নামেও পরিচিত। বর্তমানে নেত্রকোণার -সহ বিভিন্ন মিষ্টির দোকানে বালিশ মিষ্টি পাওয়া যায়।
আরও উল্লেখযোগ্য হলো, ২০২৫ সালে নেত্রকোণার বালিশ মিষ্টি জিআই (Geographical Indication) স্বীকৃতি পায়, ফলে এটি নেত্রকোণার ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও লাভ করেছে।
দুটির মধ্যে মূল পার্থক্য
সংক্ষেপে: মুক্তাগাছার মণ্ডা জমিদারি আমলের দুই শতকের ঐতিহ্য, আর নেত্রকোণার বালিশ মিষ্টি গয়ানাথ ঘোষের হাত ধরে গড়ে ওঠা শতবর্ষী মিষ্টি-সংস্কৃতির প্রতীক। দুটিই এখন শুধু খাবার নয়—নিজ নিজ এলাকার ইতিহাস, পরিচয় ও লোকসংস্কৃতির অংশ।