একসময় শহরের ময়লা-আবর্জনা ছিল দুর্গন্ধ, পরিবেশ দূষণ ও জনদুর্ভোগের অন্যতম কারণ। সেই বর্জ্যকেই সম্পদে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে শেরপুরের নকলা পৌরসভা। পরিবেশবান্ধব সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিতে পৌর এলাকার বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সার উৎপাদনের পাশাপাশি পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আলাদা করার কার্যক্রম চলছে।
নকলা পৌরসভার জালালপুর এলাকায় ১১৬ শতাংশ জমির ওপর প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে সমন্বিত কঠিন ও মানব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে নির্মিত প্ল্যান্টটি বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। নির্ধারিত প্রক্রিয়া শেষে এটি নকলা পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
প্ল্যান্টটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সমন্বয়। এখানে কঠিন ও মানব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য রয়েছে প্ল্যান্টেড ড্রায়িং বেড, অ্যানেরোবিক ব্যাফেল রিঅ্যাক্টর (এবিআর), কনস্ট্রাক্টেড ওয়েটল্যান্ড, পলিশিং পন্ড, কম্পোস্ট শেড, সর্টিং শেড, লিচেট ট্যাংক, কমবাসশন ইউনিট, পার্কিং শেড, অফিস কক্ষ ও গার্ডরুমসহ বিভিন্ন ইউনিট।
মানব বর্জ্য নিরাপদে সংগ্রহ ও পরিবহনের জন্য প্ল্যান্টে ১ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার একটি ভ্যাকুয়াম ট্রাক এবং কঠিন বর্জ্য পরিবহনের জন্য একটি গার্বেজ ট্রাক সরবরাহ করা হয়েছে।
ভ্যাকুয়াম ট্রাকের মাধ্যমে বিভিন্ন বসতবাড়ি, অফিস-আদালত ও স্থাপনার সেপটিক ট্যাংক থেকে ফিক্যাল স্লাজ সংগ্রহ করে প্ল্যান্টে এনে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। এতে উন্মুক্ত স্থানে মানব বর্জ্য ফেলা ও অপরিকল্পিত নিষ্কাশন কমানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
নির্মাণকাজের বিভিন্ন পর্যায়ে শেরপুরের জেলা প্রশাসক, স্থানীয় সরকার বিভাগের কর্মকর্তারা, প্রকল্প পরিচালক (পিডি), উপ-প্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি), জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের শেরপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক (ডিডিএলজি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, নকলা পৌরসভার তৎকালীন মেয়র ও বর্তমান প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্ল্যান্টটি পরিদর্শন করেছেন।
পরিদর্শনের সময় প্রকল্পের নির্মাণ অগ্রগতি, বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ইউনিট, অবকাঠামোর মান ও ভবিষ্যৎ পরিচালনব্যবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকির মাধ্যমে নির্মাণকাজের বিভিন্ন পর্যায়ে বাস্তবায়ন ও গুণগত মানের বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
নকলা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মাহবুবুর রহমান সুমন গণমাধ্যমকে বলেন, প্ল্যান্টটি ড্রয়িং ও ডিজাইন অনুযায়ী বাস্তবায়ন এবং গুণগত মান নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতায় নির্মাণ শেষে এটি বর্তমানে পরীক্ষামূলক পরিচালনার পর্যায়ে এসেছে।
তিনি জানান, সঠিকভাবে বর্জ্য সংগ্রহ করে বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাত করা গেলে বর্জ্য পরিবেশের বোঝা না হয়ে সম্পদে পরিণত হতে পারে।
মো. মাহবুবুর রহমান সুমন আরও বলেন, সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পৌরসভার সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণ ও যানবাহন দেওয়া হয়েছে। বাসাবাড়ির সেপটিক ট্যাংক থেকে ফিক্যাল স্লাজ নিরাপদে সংগ্রহ ও পরিবহনের জন্য ভ্যাকুয়াম ট্রাক এবং কঠিন বর্জ্য পরিবহনের জন্য গার্বেজ ট্রাক সরবরাহ করা হয়েছে।
তার ভাষ্য, কঠিন বর্জ্যের পাশাপাশি ফিক্যাল স্লাজও নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সার উৎপাদনে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে পরিবেশ দূষণ কমানোর পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নকলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আব্দুল ওয়াহেদ খান গণমাধ্যমকে বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও টেকসই কৃষিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে এ উদ্যোগ সম্ভাবনাময়। তবে জৈব সার উৎপাদনের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর উপাদান যাতে মিশে না যায়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি জানান, পর্যাপ্ত মানসম্মত জৈব সার উৎপাদন করা গেলে কৃষকেরা তুলনামূলক কম দামে তা ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারেন।
নকলা পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম গণমাধ্যমকে বলেন, নকলা পৌরসভাকে পরিচ্ছন্ন, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক পৌরসভা হিসেবে গড়ে তুলতে সমন্বিত কঠিন ও মানব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্টটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করা।
তিনি জানান, ভবিষ্যতে পৌর এলাকার শতভাগ বর্জ্য সংগ্রহের মাধ্যমে প্ল্যান্টটির উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্লাস্টিকসহ পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য রিসাইক্লিং কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, আগে যেসব বর্জ্য দুর্গন্ধ ও দূষণের কারণ হিসেবে দেখা হতো, সেগুলোই এখন প্রক্রিয়াজাত করে কৃষিতে ব্যবহারের উপযোগী সম্পদে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্ল্যান্টের আশপাশের পরিচ্ছন্ন ও সবুজ পরিবেশও স্থানীয়দের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রায় ৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ প্রকল্পের সুফল পুরোপুরি পেতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়; নিয়মিত পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণেও গুরুত্ব দিতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার, দক্ষ জনবল এবং নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে নকলার এ প্ল্যান্ট স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি কার্যকর উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
মন্তব্য করুন