কৃষক স্বামীর একার আয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছিল। তাই অভাব দূর করতে কয়েক বছর আগে হোগলা পাতার পণ্য তৈরির কাজ শুরু করেন সালমা আক্তার। দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে এই পণ্য তৈরি করে এখন মাসে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা উপার্জন করছেন তিনি। এ আয়ে সংসারে আর্থিক অবদান রাখার পাশাপাশি এই নারী স্বাবলম্বী হয়েছেন।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার সালমা আক্তারের মতো পাঁচটি গ্রামের এক হাজারের বেশি পরিবার হোগলা পাতার পণ্য বানিয়ে নিজেদের আর্থিক দুর্দশা কাটিয়েছে। এ ব্যবসায় নেমে তরুণ উদ্যোক্তাদেরও ভাগ্য বদলেছে। হোগলা পাতার তৈরি কারুপণ্যের মধ্যে রয়েছে ব্যাগ, ঝুড়ি, বাক্স, ফুলদানি, বসার পাটি, ফ্লোরম্যাট, টেবিল রানার, পাপোশ, টব, টুপি। বাংলাদেশে এসব পণ্যের খুব একটা চাহিদা নেই। তবে ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এগুলো রপ্তানি হচ্ছে। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব এই পণ্যের চাহিদা ক্রমে বাড়ছে।
হোগলা পাতার পণ্য তৈরি করে ফুলবাড়িয়ার বাকতা ইউনিয়নের নিশ্চিন্তপুর, ভালুকজান, কৈয়ারচালা এবং কুশমাইল ইউনিয়নের কুশমাইল ও বরুকা গ্রামের চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। প্রতিটি বাড়ির উঠানে দেখা যায় এই পাতার রশি দিয়ে নানা ধরনের কারুপণ্য তৈরি হচ্ছে। নারীরাই এ কাজ বেশি করছেন। পড়াশোনার ফাঁকে কারুপণ্য তৈরি করছেন শিক্ষার্থীরাও।
আছে অনুপ্রেরণার গল্প
এই শিল্পের সফল উদ্যোক্তাদের মধ্যে রয়েছেন আলমাস আলী, মোজাম্মেল হোসেন, জামান মিয়া। আলমাসের গল্পটা অনুপ্রেরণার। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি ঢাকায় একটি হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন। পরে অভিজ্ঞতা নিয়ে গ্রামে ফিরে ২০১৬ সালে হোগলা পাতার পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নেন। বর্তমানে তাঁর মাধ্যমে অসংখ্য নারী কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন এবং তিনি বছরে প্রায় এক কোটি টাকার পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত।⋮
একইভাবে মোজাম্মেলও নিজের পরিশ্রমে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। সংসারের অভাবের কারণে কিশোর বয়সে ঢাকায় গিয়ে হস্তশিল্পের কাজ শেখেন। পরে গ্রামে ফিরে ২০ জন নারীকে নিয়ে কাজ শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘এমএইচ হ্যান্ডি ক্র্যাফট’-এর মাধ্যমে প্রায় ২৫০ পরিবার জীবিকা নির্বাহ করছে।
এই শিল্পের সবচেয়ে বড় সুফল পাচ্ছেন গ্রামীণ নারীরা। কৈয়ারচালা গ্রামের সালমা আক্তার ও মোমেনা খাতুনের মতো অনেকে জানান, হোগলা পাতার পণ্য তৈরি করে সংসারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যয়ও বহন করতে সক্ষম হচ্ছেন।
পরিবেশবান্ধব হওয়ায় বাড়ছে চাহিদা
উদ্যোক্তা মোজাম্মেল হোসেন বলেন, হোগলা পাতা এবং এই পাতার রশি বরিশাল, নোয়াখালী ও ভোলা থেকে কেনা হয়। হোগলা পাতার রশি এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকা বান্ডিল এবং হোগলা পাতার বান্ডিল ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় কিনতে হয়। ঢাকা থেকে কোম্পানির লোক এসে তাদের নির্দেশ অনুযায়ী তৈরি পণ্য বিভিন্ন দাম কিনে নিয়ে যান।
সাধারণত ৫ থেকে ১২ ফুট উচ্চতার হোগলা পাতা রোদে শুকিয়ে বিশেষ কায়দায় পাতা পেঁচিয়ে প্রথমে দড়ি বানানো হয়। হোগলা পাতা আড়াআড়ি ও দড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে পছন্দের কারুপণ্যের রূপ দেওয়া হয়। আকার ঠিক রাখার জন্য অধিকাংশ কারুপণ্য বানাতে লোহা ও জিআই তারের ডাইস ব্যবহার করা হয়। হোগলা পাতাসহ এসব পণ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজটি করে কারখানা। এরপর পণ্য তৈরির জন্য দেওয়া হয় নির্দিষ্ট সময়। তৈরি হয়ে গেলে কারখানা থেকে কর্মী এসে নারীদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করেন। পণ্যের ধরন ও আকারভেদে একজন নারী শ্রমিক প্রতিটি পণ্যের জন্য ৩৫ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান।
পরিবেশবান্ধব হওয়ায় এসব পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারেও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ায় বিদেশি ক্রেতারা এখন হোগলা পাতার তৈরি পণ্যের দিকে ঝুঁকছেন।
তৈরি হচ্ছে ১২০ ধরনের পণ্য
উদ্যোক্তারা জানান, পাঁচটি গ্রামে হোগলা পাতার প্রায় ১২০ ধরনের পণ্য তৈরি হয়, যার বার্ষিক বাজারমূল্য প্রায় তিন কোটি টাকা। তারা মনে করেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন হলে উৎপাদন ও বিক্রি বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
ফুলবাড়িয়ার হোগলা পাতার শিল্পের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান বিডি ক্রিয়েশন। ২০০৯ সালে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি ২০১৩ সালে ফুলবাড়িয়াসহ ময়মনসিংহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে। প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় নারী-পুরুষদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি করেছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
বিডি ক্রিয়েশনের অপারেশন ম্যানেজার মোতালেব হোসেন জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানে অবহেলায় পড়ে থাকা হোগলা পাতা, খেজুরপাতা, তালপাতা, বাঁশ ও বেত ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২০০ কোটি টাকার হস্তশিল্প পণ্য বিদেশে রপ্তানি করেছে।
ফুলবাড়িয়া উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা রওশন জাহান বলেন, তরুণ উদ্যোক্তাদের এই উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এবং বেকারত্ব কমাতে ভূমিকা রাখছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম সোহাগ মনে করেন, হোগলা পাতার এই শিল্প শুধু কর্মসংস্থানই নয়; বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তিনি বলেন, হোগলা পাতা শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশই নারী। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন নারীদের কাজের সুযোগ ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা বাড়ছে, অন্যদিকে পরিবারেও তাদের মতামত ও গুরুত্ব বাড়ছে।
মন্তব্য করুন