আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে ব্রহ্মপুত্র নদ। চারপাশে রাতের নীরবতা। এরই মধ্যে ভেসে আসছে লালনের গান। নদপারের সড়ক দিয়ে যাওয়া পথচারীরাও যানবাহন থামিয়ে উঁকি দিচ্ছেন গানের আসরে। কেউ দাঁড়িয়ে শুনছেন, কেউবা সুরের টানে হারিয়ে যাচ্ছেন ভাবের জগতে।
ব্যানারে লেখা ‘পূর্ণিমার রাতে পরমের সাথে’। ময়মনসিংহ বাউল সমিতির উদ্যোগে নগরীর বুড়াপীর মাজার সংলগ্ন এলাকায় প্রতি পূর্ণিমায় বসে এ গানের আসর। গত রোববার (২৫ অক্টোবর) রাতে শরৎকালের দ্বিতীয় পূর্ণিমায় ষষ্ঠবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় আয়োজনটি।
এবারের আসর সাজানো হয়েছিল বাউলসম্রাট লালন শাহের তিরোধান উপলক্ষে তাঁর গান দিয়ে। ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নবীন ও খ্যাতিমান বাউলশিল্পীরা এতে অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন নগরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও।
চাঁদের আলোয় রাত যত গভীর হয়েছে, ততই জমে উঠেছে আধ্যাত্মিক গানের আসর। একতারা, দোতারা ও নানা বাদ্যযন্ত্রের সুরে পরিবেশিত লালনগীতি, সুফিগান ও ভক্তিগীতি মুগ্ধ করেছে দর্শক-শ্রোতাদের।
পথ দিয়ে যাওয়ার সময় গানের সুরে আকৃষ্ট হয়ে আসরে দাঁড়ান আহাদ মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমি এ পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম। গানের সুর শুনে দেখতে আসি। খুবই সুন্দর আয়োজন। মন চাইছে সারা রাত ধরে গান শুনি।’
আয়োজকেরা জানান, অনুষ্ঠানটি সাজানো হয়েছিল দুটি পর্বে। প্রথম পর্বে মাগরিবের নামাজের পর বিশ্বশান্তি ও সবার মঙ্গল কামনায় মিলাদ ও দরুদ শরিফ পাঠ করা হয়। এতে নেতৃত্ব দেন পীর খোরশেদ আলম দয়াল। এশার নামাজের পর শুরু হয় মূল গানের আসর।
গান পরিবেশন করেন মিজান বাউলা, জয়িতা অর্পা, চন্দন শাহ, বাউল সোহাগী সরকার, শাহনাজ সাথী, বাউল চান মিয়া, বাউল মালেকা খাতুন, বাউল সাবিনা সরকার, বাউল সাজন মালা, বাউল নুর আলম সরকার, বাউল মাফিজুল সরকার, রফিক চিশতি, বাউল রাজ্জাক সরকার, বাউল রুমা সরকার, বাউল এরশাদ ও বাউল আবদুল মজিদ।
বাদ্যযন্ত্রে ছিলেন হারমোনিয়ামে কাদির, বাঁশিতে আজিজুল, ট্রাম্পেটে হামিদ ভাণ্ডারী, রবাবে হাবিব, করতালে মোশাররফ, খমকে মিজান এবং ঢোলে রাজকুমার দাস, বিশাল ও শরীফ।
সৃষ্টি ও স্রষ্টার সম্পর্ক, জীবনের দর্শন এবং পরমের সন্ধান নিয়ে রচিত লালনের কালজয়ী গানগুলো মুক্ত আকাশের নিচে অন্য রকম এক আবহ তৈরি করে। পূর্ণিমার আলো আর আধ্যাত্মিক সুরে মগ্ন হয়ে পড়েন উপস্থিত শ্রোতারা।
ময়মনসিংহ বাউল সমিতির সহসভাপতি কাজল দেওয়ান বলেন, ‘যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা ভুলে মানুষের মনকে পরিশুদ্ধ করা এবং আধ্যাত্মিক চেতনার মাধ্যমে সমাজে সম্প্রীতি বজায় রাখাই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য।’
সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম আসলাম বলেন, সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণাকে পুঁজি করে ভবিষ্যতেও প্রতি পূর্ণিমায় এ আয়োজন অব্যাহত থাকবে।
ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে পূর্ণিমার আলোয় লালনের গান আর বাউলদের সুরে রাতটি যেন হয়ে উঠেছিল আত্মার সঙ্গে আত্মার সংযোগের এক নিবিড় আয়োজন।
মন্তব্য করুন