Author
১ অক্টোবর ২০২৬, ২:০১ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

হাওরে বজ্রপাতের আতঙ্ক, ৭ বছরে ঝরেছে ৭৯ প্রাণ

নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ হাওর ও বিল এলাকায় বজ্রপাতের আতঙ্ক কাটছে না। কৃষিকাজ, মাছ ধরা, গবাদিপশু চরানো ও হাঁস পালনের সঙ্গে যুক্ত মানুষকে প্রায়ই জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়ে খোলা মাঠে যেতে হয়। বিশেষ করে এপ্রিল ও মে মাসে বোরো ধান কাটার মৌসুমে বাড়ে বজ্রপাতের ঝুঁকি। গত সাত বছরে জেলায় বজ্রপাতে অন্তত ৭৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।

প্রাণহানি কমাতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলোর বেশির ভাগই কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। হাওরাঞ্চলে স্থাপন করা বজ্রনিরোধক দণ্ডের (লাইটনিং অ্যারেস্টার) অনেকগুলোই রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। একইভাবে তালগাছ রোপণের উদ্যোগও পরিচর্যার অভাবে থেমে গেছে। ফলে বজ্রপাতের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বজ্রপাতে ৮ জন, ২০২১ সালে ১৫ জন, ২০২২ সালে ৩ জন, ২০২৩ সালে ১২ জন, ২০২৪ সালে ৮ জন এবং ২০২৫ সালে ১৬ জন মারা গেছেন। চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মারা গেছেন আরও ১৭ জন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সরকারি হিসাবের চেয়ে প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা আরও বেশি।

সর্বশেষ গত ১৭ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে খালিয়াজুরী উপজেলার মেন্দিপুর ইউনিয়নের সাতগাঁও গ্রামের ইছাক মিয়ার ছেলে শফিকুল মিয়া বাড়ির সামনের হাওরে হাঁস চরাতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যান।

নেত্রকোনার হাওরাঞ্চল বজ্রপাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলকে বিশ্বের অন্যতম বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের তীব্রতা বাড়ছে বলেও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।

হাওরে বসানো দণ্ড এখন অকার্যকর

বজ্রপাতজনিত মৃত্যু কমাতে ২০২২ সালে নেত্রকোনার বিভিন্ন স্থানে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় ৩২টি লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন করা হয়েছিল। প্রতিটি দণ্ড স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছিল ছয় থেকে আট লাখ টাকা।বিজ্ঞাপন

নিয়ম অনুযায়ী, এসব দণ্ড হাওর বা খোলা প্রান্তরে স্থাপনের কথা। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক দণ্ড বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন কিংবা জনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে। স্থাপনের দুই বছরের মধ্যেই রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক দণ্ড অকার্যকর হয়ে পড়ে। কোথাও কোথাও যন্ত্রাংশও চুরি হয়ে গেছে। কোনো কোনো স্থানে এখন শুধু খুঁটি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে দণ্ডগুলো।

খালিয়াজুরী উপজেলার মেন্দিপুর গ্রামের কৃষক আরিফ চৌধুরী, মদনের গোবিন্দশ্রী গ্রামের আবুল হাসেম ও মোহনগঞ্জের আদর্শনগর গ্রামের সবুজ মিয়া বলেন, খালিয়াজুরীর প্রবেশমুখ উচিতপুরে একটি বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করা হয়েছে। তবে হাওরের ফাঁকা জায়গার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় দণ্ড স্থাপন করা হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় এসব দণ্ড এখন কার্যকর নয়।

পরিচর্যার অভাবে তালগাছ প্রকল্পও থমকে

বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশজুড়ে তালগাছ রোপণের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। ২০১৮ সালে নেত্রকোনাতেও এ প্রকল্পের আওতায় তালগাছের চারা রোপণ করা হয়।

তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রোপণের পর চারাগুলোর যথাযথ পরিচর্যা করা হয়নি। ফলে বেশির ভাগ চারা মারা গেছে। কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া এই উদ্যোগেরও এখন দৃশ্যমান কোনো সুফল নেই।

কৃষিবিদ ড. শওকত আকবর বলেন, তালগাছের উচ্চতা ও গঠনগত বৈশিষ্ট্য বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক বলে মনে করা হয়। তালগাছের বাকলে কার্বনের স্তর থাকায় বজ্রপাত থেকে সুরক্ষায় এটি ভূমিকা রাখতে পারে। ২০১৮ সালে সারা দেশের মতো নেত্রকোনাতেও তালগাছ রোপণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রোপণের পর পরিচর্যা না থাকায় এখন এসব গাছের অস্তিত্বই নেই। ফলে প্রকল্পটি থেকে কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।

খালিয়াজুরী উপজেলা সদরের বাসিন্দা শামসুল হক বলেন, মানুষের জীবন রক্ষায় স্থাপন করা বজ্রনিরোধক দণ্ডগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভাগের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। তা না হলে বজ্রপাতে প্রাণহানি আরও বাড়তে পারে।

দণ্ডের বদলে আশ্রয়কেন্দ্রের পরিকল্পনা

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, খালিয়াজুরী, মদন, মোহনগঞ্জ, কলমাকান্দা, কেন্দুয়া ও নেত্রকোনা সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ, বিল ও ফাঁকা জায়গায় ৩৪টি লাইটনিং অ্যারেস্টার স্থাপন করা হয়েছিল। এসব দণ্ডে বিশেষ ধরনের ম্যাগনেট রয়েছে, যা ৩০০ ফুট এলাকা কভার করতে পারে। তবে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়বহুল। এ কারণে বর্ষা ও বৃষ্টির সময় হাওরের কৃষকেরা যাতে বজ্রপাত থেকে দ্রুত আশ্রয় নিতে পারেন, সে জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের কথা ভাবা হচ্ছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, বজ্রপাতে নিহতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। কৃষক, শ্রমিকসহ হাওরাঞ্চলের মানুষকে বজ্রপাত থেকে রক্ষায় জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি ঝড়-বৃষ্টির সময় যাতে তারা দ্রুত আশ্রয় নিতে পারেন, সে জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে হাওরাঞ্চলে পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে।

Facebook Comments Box
১ম লাইন রঙ
২য় লাইন রঙ
ফন্ট সাইজ (65px)

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিরোধীদের কর্মসূচির মুখে তৎপরতা বাড়াচ্ছে বিএনপি

১

যৌথ অভিযান নয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত কার্যক্রম নিয়মিত প্রক্রিয়া: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

২

প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখতে পরশুরামে মানুষের ঢল

৩

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন সারজিস আলম

৪

সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে প্রয়োজন অনুযায়ী যে কোনো পদক্ষেপ নেবে কমিশন

৫

ফসলি জমি কেটে ২০ হাজার ঘনফুট মাটি পাচার, ভৈরবে জাহাজ জব্দ

৬

বিস্কুটের লোভ দেখিয়ে শিশুকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা, জনতার হাতে আটক

৭

হাওরে বজ্রপাতের আতঙ্ক, ৭ বছরে ঝরেছে ৭৯ প্রাণ

৮

‘কাফনের কাপড় নিয়ে এসেছি, না খেয়ে মরব, তবু নিয়োগপত্র ছাড়া ফিরব না’

৯

বিদ্যালয়ের অফিসে শিক্ষককে লাঞ্ছিতের অভিযোগ প্রধান শিক্ষকের স্বামীর বিরুদ্ধে

১০

বিদ্যুতের তারে জড়ানো ভাইকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ গেল অপর ভাইয়েরও

১১

ময়মনসিংহে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের মামলায় দুই যুবকের যাবজ্জীবন

১২

শিক্ষকের মুক্তির দাবিতে মিছিল, দুর্বৃত্তের হামলায় আহত ১০ স্কুলশিক্ষার্থী

১৩

পূর্বধলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাণীর কামড়ে চিকিৎসা মিলছে, পর্যাপ্ত অ্যান্টি-র‍্যাবিস টিকা মজুত

১৪

নেত্রকোনায় সোলার সার্ভিস প্রোভাইডার তালিকাভূক্তির প্রক্রিয়া অবহিতকরণ সংক্রান্ত মতবিনিময় সভা

১৫

নেত্রকোনায় বজ্রপাতে ৭ বছরে ৭৯ জনের মৃত্যুঃ নেই কার্যকর পদক্ষেপ

১৬

পূর্বধলায় কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়ে হামলার মামলায় জামায়াতের ২৫ জন কারাগারে

১৭

পূর্বধলায় ভিক্ষাবৃত্তি করা আমেনা খাতুন পেলেন মুদি দোকান

১৮

নকলায় ৩৭ বোতল এস্কাফ সিরাপসহ তরুণী আটক

১৯

কিশোরগঞ্জে ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু শনাক্ত আরও ৪০ জন

২০
শিরোনামঃ
❮বিরোধীদের কর্মসূচির মুখে তৎপরতা বাড়াচ্ছে বিএনপি❮যৌথ অভিযান নয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত কার্যক্রম নিয়মিত প্রক্রিয়া: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী❮প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখতে পরশুরামে মানুষের ঢল❮প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন সারজিস আলম❮সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে প্রয়োজন অনুযায়ী যে কোনো পদক্ষেপ নেবে কমিশন❮ফসলি জমি কেটে ২০ হাজার ঘনফুট মাটি পাচার, ভৈরবে জাহাজ জব্দ❮বিস্কুটের লোভ দেখিয়ে শিশুকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা, জনতার হাতে আটক❮হাওরে বজ্রপাতের আতঙ্ক, ৭ বছরে ঝরেছে ৭৯ প্রাণ❮‘কাফনের কাপড় নিয়ে এসেছি, না খেয়ে মরব, তবু নিয়োগপত্র ছাড়া ফিরব না’❮বিদ্যালয়ের অফিসে শিক্ষককে লাঞ্ছিতের অভিযোগ প্রধান শিক্ষকের স্বামীর বিরুদ্ধে