শেরপুরের নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের চরমধুয়া গ্রামে মৃগী নদীর ভয়াবহ ভাঙন দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে চলা এই ভাঙনে ইতোমধ্যে পাঁচ শতাধিক পরিবার তাদের বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। নদীর গ্রাসে বিলীন হয়ে যাচ্ছে একের পর এক বাড়িঘর, আর ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই দীর্ঘমেয়াদী ভাঙনের ফলে চরমধুয়া গ্রামের বহু পরিবার সহায়-সম্বল হারিয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। কেউ নতুন করে ঘর তুলেছেন, আবার কেউ জীবিকার সন্ধানে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাড়ি জমিয়েছেন। গ্রামের সাফিকুল ইসলাম, আলম আলী ও সায়েদ মিয়ার মতো অনেকেই ইনকিলাবকে জানান, ভাঙনের কারণে তাদের চলাচলের রাস্তাও বিলীন হয়ে গেছে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।
চরমধুয়া এলাকা ধান, পাট, ভুট্টা ও সরিষাসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ হিসেবে পরিচিত হলেও, প্রতি বছর নদীভাঙন ও পাহাড়ি ঢলের কারণে ফসলি জমি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ভাঙনের ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। পাকা সড়ক থেকে গ্রামের দিকে যাওয়া প্রায় তিন মাইলের মাটির রাস্তাটিও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় কৃষিপণ্য পরিবহনে এখন ঘোড়ার গাড়িই একমাত্র ভরসা। এক ক্ষতিগ্রস্ত নারী জানান, তার ৫-৬ কাঠা জমিসহ ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। প্রায় পাঁচ লাখ টাকার বাঁশঝাড়ও নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে, কিন্তু বারবার অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার মেলেনি। স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ভয়ে ভয়ে বলে, “স্কুল ভেঙে যাচ্ছে, রাস্তাও ভেঙে যাচ্ছে। এখন চলাফেরা করতে ভয় লাগে।”
প্রায় তিন হাজার মানুষের বসবাস এই চরমধুয়া গ্রামে দীর্ঘকাল ধরে নদীভাঙন রোধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তারা দ্রুত ভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্নির্মাণ এবং ঝুঁকিতে থাকা স্থাপনাগুলো রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে নকলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহাঙ্গীর আলম দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, “অতিবৃষ্টি এবং ঢলের কারণে নকলা উপজেলার মৃগী নদীর চরমধুয়া নামাপাড়া ও দড়িপাড়া এলাকায় তীব্র ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে মাননীয় সংসদ সদস্য, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসকসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে আমরা ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছি। ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছি।”
শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুদীপ্ত চৌধুরী ইনকিলাবকে জানান, “মৃগী নদীর চরমধুয়া এলাকার সাড়ে আটশো মিটার ভাঙনকবলিত স্থান আমরা পরিদর্শন করেছি। ইতোমধ্যে শেরপুর জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া মাত্রই ভাঙনরোধে কাজ শুরু করা হবে।”
মন্তব্য করুন