একটা শহরের গল্প কখনো কখনো একজন মানুষকে ঘিরেই বদলে যায়। ঠাকুরগাঁওয়েও যেন তেমনটাই হয়েছে। যে শহরের চায়ের আড্ডায় এতদিন রাজনীতি, বাজারদর, কৃষির অবস্থা কিংবা স্থানীয় নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো, সেখানে এখন ঘুরেফিরে একটাই নাম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যানের চেয়ার থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবার দেশের রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্ত জানানোর পরপরই বদলে যায় ঠাকুরগাঁওয়ের পরিবেশ। দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে উচ্ছ্বাস। জেলা বিএনপির কার্যালয়ে শুরু হয় মিষ্টি বিতরণ।
খবরটা শহর ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় গ্রামেও। ঠাকুরগাঁও শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে অজপাড়াগাঁ, চায়ের দোকানের আড্ডা থেকে ফেসবুক—সবখানেই এখন একটাই আলোচনা, মির্জা ফখরুল দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে যাচ্ছেন।
সাধারণ মানুষের আবেগের জায়গাটিও আলাদা। তাদের অনেকের কাছে এটি শুধু একজন রাজনীতিকের দলীয় মনোনয়ন নয়, ঠাকুরগাঁওয়ের একজন মানুষ দেশের শীর্ষ সাংবিধানিক পদে আসীন হওয়ার সম্ভাবনা। তাই বিষয়টিকে তারা দেখছেন উত্তরাঞ্চলের জন্যও ঐতিহাসিক গর্বের মুহূর্ত হিসেবে।
সেই পথ আর থেমে থাকেনি। তৃণমূল থেকে উঠে এসে ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করেন বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে একসময় দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব নেন। পরে ২০১৬ সালে হন পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। এরপর প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে রাজপথের আন্দোলন, অসংখ্য মামলা এবং নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। এসবের মধ্য দিয়েই দল পরিচালনা করে গেছেন তিনি। ফলে রাষ্ট্রপতি পদে তার দলীয় মনোনয়নের খবর ঠাকুরগাঁওয়ে পৌঁছানোর পর আনন্দটা শুধু রাজনৈতিক কার্যালয়ের চার দেওয়ালে আটকে থাকেনি। ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের মুখে মুখে।
ঠাকুরগাঁও সদরের আকচা ইউনিয়নের কৃষক রমজান আলীর কথাতেই যেন সেই আবেগের পুরোটা ধরা পড়ে। তিনি বলেন, ‘ফখরুল সাব হামার ঘরের লোক। বছরের পর বছর হকের লড়াইয়ে ত্যাগের পর উনি আইজ সর্বোচ্চ সম্মান পাইতেছেন, শুনেই হামার কলিজা জুড়ায়ে গেছে!’
তরুণদের মধ্যেও এ নিয়ে তৈরি হয়েছে উচ্ছ্বাস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইছে অভিনন্দনের জোয়ার। বিভিন্ন পোস্ট, ছবি ও শুভেচ্ছাবার্তায় সরব হয়ে উঠেছে ফেসবুক।
ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী রিফাত বলেন, ওনার (মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর) শিক্ষা, জ্ঞান ও রাজনৈতিক পরিপক্বতা থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। তিনি বঙ্গভবনে গেলে তা আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা হবে।
মির্জা ফখরুলের আরেকটি পরিচয় তার শিক্ষকতা। তাই সাবেক এই শিক্ষকের রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নকে অনন্য উচ্চতায় দেখছেন শিক্ষক সমাজের অনেকে। ঠাকুরগাঁও বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক তাপস দেবনাথ বলেন, একজন সাবেক শিক্ষক যখন দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আসনে বসেন, তা শিক্ষক সমাজের মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। আমাদের বিশ্বাস, শিক্ষার মানোন্নয়নে তিনি কার্যকর দৃষ্টিভঙ্গি রাখবেন।
ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী বলেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শুধু বিএনপির সম্পদ নন, তিনি সমগ্র দেশের রাজপথের লড়াই-সংগ্রামের পরীক্ষিত নেতা। দীর্ঘ নির্যাতন-পীড়ন সহ্য করে তিনি যেভাবে গণতন্ত্রের ঝাণ্ডা ধরে রেখেছেন, এই মনোনয়ন তার সেই অসামান্য ত্যাগেরই রাষ্ট্রীয় মূল্যায়ন। আমাদের বিশ্বাস, তিনি দেশের একজন সফল অভিভাবক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করবেন।
তবে রাজনীতির মাঠে মতের পার্থক্য থাকলেও মির্জা ফখরুলের মনোনয়নকে ঠাকুরগাঁওয়ের জন্য বিশেষ অর্জন হিসেবে দেখছেন স্থানীয় জামায়াতসহ অন্যান্য দলের নেতারাও।
ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কফিলউদ্দিন আহমদ বলেন, দলীয় আদর্শের ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু ঠাকুরগাঁওয়ের সন্তান হিসেবে রাষ্ট্রপতির আসনে মির্জা ফখরুল সাহেবের মনোনয়ন আমাদের পুরো জেলার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে তিনি সব দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থে কাজ করবেন বলেই আমাদের প্রত্যাশা।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার খবরে আনন্দে মিষ্টিমুখের দৃশ্যও দেখা গেছে। রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে শুরু করে নেতাকর্মীদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ সবখানেই ছিল আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার আয়োজন। তবে এই আনন্দের মাঝেও একটি কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন সুশীল ও সচেতন সমাজের প্রতিনিধিরা। রাষ্ট্রপতির পদটি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে একটি নিরপেক্ষ সাংবিধানিক অবস্থান। তাই সেখানে পৌঁছানোর পর দায়িত্বটিই হবে বড় পরিচয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ঠাকুরগাঁও জেলার নাজমুল ইসলাম বলেন, মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ সংসদীয় ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তাকে একজন নিরপেক্ষ ও বিচক্ষণ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ভূমিকা রাখতে সহায়তা করবে। সংবিধানের মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভারসাম্য রক্ষায় তিনি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রাখবেন বলেই আশা করি।
এখন সামনে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। মনোনয়ন ঘোষণার পর দেশের নজর সেদিকেই। আর ঠাকুরগাঁওবাসী তাকিয়ে আছেন সেই মাহেন্দ্রক্ষণের দিকে কখন তাদের ‘ঘরের ছেলে’ আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক অভিভাবকের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। ততদিন পর্যন্ত ঠাকুরগাঁওয়ের চায়ের দোকানে আলোচনা চলবে, ফেসবুকে অভিনন্দনের পোস্ট আসবে, দলীয় কার্যালয়ে মিষ্টি বিলি হবে। আর গ্রামের কোনো এক আড্ডায় হয়তো আবারও কেউ বলে উঠবেন—‘ফখরুল সাব তো হামারই মানুষ!’
মন্তব্য করুন