Author
১৪ অগাস্ট ২০২৬, ১২:২৬ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

২০ পাল পরিবারের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন সমীর

শ্রাবণের বিকেল। মেঘে ঢাকা আকাশ। বরিশালের বাকেরগঞ্জের কলসকাঠি পালপাড়ার ছোট্ট কর্মশালায় একটিমাত্র বৈদ্যুতিক বাতির আলো মিটমিট করে জ্বলছে। চারদিকে সারি সারি সাদা মাটির ঘট (পাত্র)। কোনোটি খড়িমাটির প্রলেপে ঢাকা, কোনোটি হলুদ রঙে দেবীর অবয়বের প্রথম রেখা পেয়েছে। মেঝেতে বসে মৃৎশিল্পী সমীর পাল। সামনে রঙের পাত্র, হাতে সরু তুলি।

ধীরে ধীরে সমীর আঁকছেন দেবী মনসার মুখ, কালো চুল, লাল শাড়ি ও মাথার ওপর ফণা তোলা সাপ। তুলির কয়েকটি আঁচড়ে সাদা মাটির ঘটটি যেন প্রাণ ফিরে পায়। শ্রাবণসংক্রান্তি ঘিরে মনসাপূজার আয়োজন চলছে। পূজাটির অন্যতম উপকরণ মনসাঘট তৈরিতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন সমীর পাল। একসময় বাকেরগঞ্জের কলসকাঠি পালপাড়ায় অনেক পরিবার এই বিশেষ ঘট তৈরি করত। এখন সেখানে এ কাজ করছেন একমাত্র সমীর পাল।

বাংলার লোকবিশ্বাসে মনসা সর্পদেবী হিসেবে পরিচিত। বর্ষাকালে সাপের উপদ্রব থেকে রক্ষা, পরিবারের মঙ্গল, উর্বরতা ও সমৃদ্ধির আশায় তাঁর পূজা করা হয়। বরিশাল অঞ্চলে মনসাপূজার ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মনসামঙ্গল কাব্য ও কবি বিজয় গুপ্তর স্মৃতি।

অন্য এলাকার ঘটের তুলনায় বরিশালের ঘটের বিশেষত্ব এর গঠনে। এখানে ঘটের আকৃতির সঙ্গে পবিত্রতা ও উর্বরতার প্রতীকী ধারণা যুক্ত। এটি স্থানীয় মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসের অংশ।

যেখানে মাটি কথা বলে

গত ৩০ জুলাই পূজার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে কলসকাঠির পালপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, মৃৎশিল্পীদের ব্যস্ততা। কোথাও কাঁচা মাটি প্রস্তুত করা হচ্ছে, কোথাও ছাঁচে তৈরি হচ্ছে ঘট। নারী-পুরুষ, শিশু থেকে বৃদ্ধ—কেউ না কেউ কোনো কাজে ব্যস্ত। কেউ মনসার প্রতিমা গড়ছেন, কেউ লক্ষ্মী বা সরস্বতীর প্রতিমা। তবে চোখে পড়ে সারি সারি মনসাঘট।

স্থানীয় লোকজন বলেন, একসময় পালপাড়ার প্রায় প্রতিটি পরিবারই মনসাঘট তৈরি করত। এখন প্রায় ২০টি পাল পরিবারের মধ্যে কলসকাঠিতে এ কাজ করেন শুধু সমীর পাল।

সমীরের বয়স ৩৫ বছর। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা নারায়ণ চন্দ্র পালের কাছ থেকে এই কাজ শেখেন। পড়াশোনার ফাঁকে বাবাকে কাজে সহযোগিতা করতেন। প্রায় ১৫ বছর আগে বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে আসে। তখন তিনি এইচএসসি পাস করেছেন। পড়াশোনা ছেড়ে পুরোদমে মৃৎশিল্পের কাজে যুক্ত হন।

সমীরের সংসারে স্ত্রী অনিমা, দেড় বছরের মেয়ে শ্রেয়সী এবং বৃদ্ধ মা পুষ্প রানী। সমীর পাল বলেন, সামনে মনসাপূজা, তাই এ সময় বেশি ব্যস্ত।

বিজয় গুপ্তর স্মৃতিও জড়িয়ে

মনসাপূজার ইতিহাস বাংলার সাহিত্য ও লোকবিশ্বাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বাংলার মানুষের কাছে মনসার সবচেয়ে জনপ্রিয় পরিচয় এসেছে মনসামঙ্গল কাব্যর মাধ্যমে। চাঁদ সওদাগরের সঙ্গে দেবী মনসার দ্বন্দ্ব, লখিন্দরের সর্পদংশনে মৃত্যু এবং মৃত স্বামীকে ভেলায় নিয়ে বেহুলার দেবলোকে যাত্রার কাহিনি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাংলার মানুষের মধ্যে প্রচলিত। এই কাহিনি শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের অংশ নয়, বাংলা সাহিত্য, সংগীত, পালাগান ও লোকনাট্যেরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

আগৈলঝাড়া উপজেলার গৈলায় কবি বিজয় গুপ্তর স্মৃতিবিজড়িত মনসামন্দির আছে। শ্রাবণ এলেই সেখানে মনসামঙ্গলের পদাবলি পাঠ ও পূজার আয়োজন হয়। মনসাপূজা ও মনসামঙ্গল কাব্যর নানা উপাদান বরিশালের লোকসংস্কৃতির সঙ্গেও মিশে আছে।

বরিশাল চারুকলার সংগঠক ও মৃৎশিল্প নিয়ে কাজ করা সুশান্ত ঘোষ বলেন, ‘অন্য এলাকার ঘটের তুলনায় বরিশালের ঘটের বিশেষত্ব এর গঠনে। এখানে ঘটের আকৃতির সঙ্গে পবিত্রতা ও উর্বরতার প্রতীকী ধারণা যুক্ত। এটি স্থানীয় মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসের অংশ।’

টিকে থাকার লড়াই

সমীর পাল এবার প্রায় ১৫০টি মনসাঘট তৈরি করছেন। প্রতিটির দাম ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। একটি ঘট তৈরিতে খরচ হয় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। সমীর পাল বলেন, ‘আগের মতো চাহিদা নেই। হিসাব করলে এই কাজ করে সংসার চালানো কঠিন। তারপরও ছাড়তে পারি না। এ কাজই তো আমাদের পরিচয়।’

একসময় যে পালপাড়ায় বহু পরিবার মনসাঘট তৈরি করত, সেখানে এখন হাতে গোনা কয়েকজন কারিগর এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। সমীরের হাতে একেকটি মাটির ঘট তৈরি হয়। পূজা শেষে সেগুলো হয়তো হারিয়ে যাবে কোনো ঘরের আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে। কিন্তু সেই ঘট তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কারিগরের দক্ষতা ও উত্তরাধিকার টিকে থাকবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

Facebook Comments Box
১ম লাইন রঙ
২য় লাইন রঙ
ফন্ট সাইজ (65px)

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জিসিসি শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা, মানবসম্পদ উন্নয়নে জোর

মির্জা আব্বাস সংসদে এলেন হুইলচেয়ারে, দিলেন আবেগঘন বক্তৃতা

ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে প্রেসক্লাবে বৃদ্ধা মা

কটিয়াদীর দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে জলাবদ্ধতা নিরসনে এমপির চিঠি

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য দেড় কোটি টাকার স্কুল ভবন ৬ বছরেও ব্যবহৃত হয়নি

কলমাকান্দায় আগুনে পুড়ল ছয় দোকান

মোহনগঞ্জ পাবলিক হাই স্কুলে এডহক কমিটির সভাপতিকে বরণ

মোহনগঞ্জে চিকাডুবি হাওরে বাঁধের ব্লক নিয়ে তোলপাড়

কেন্দুয়ায় ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

কেন্দুয়া প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে ইউএনওর মতবিনিময়

১০

গফরগাঁওয়ে আগুনে চার দোকান পুড়ে ছাই

১১

পরকীয়া সন্দেহে স্ত্রীকে কুপিয়ে নিজের গলা কেটেছেন এক বৃদ্ধ

১২

ঝিনাইগাতীতে সিসি সড়ক নির্মাণে সীমান্তবাসীর স্বস্তি

১৩

কলকাতা ভ্রমণে বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা

১৪

গুগলের বিজ্ঞাপন ব্যবসায় পরিবর্তনের নির্দেশ আদালতের, কারণ কী

১৫

সপ্তাহে ২ দিন ছুটিসহ ওয়ার্ল্ড ভিশনে চাকরি

১৬

কটিয়াদীতে আ.লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ৬ নেতাকর্মী গ্রেফতার

১৭

রৌহাডুবি বিলে স্নিগ্ধতা ছড়াচ্ছে

১৮

প্রতিনিয়ত ধরা পড়ছে চোরাচালান ধরাছোঁয়ার বাইরে চক্রের সদস্যরা

১৯

মমেক হাসপাতাল ।। লিফট অচল রেখে কোটি টাকা আত্মসাৎ, রোগীদের ভোগান্তি

২০
শিরোনামঃ
জিসিসি শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা, মানবসম্পদ উন্নয়নে জোরমির্জা আব্বাস সংসদে এলেন হুইলচেয়ারে, দিলেন আবেগঘন বক্তৃতাছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে প্রেসক্লাবে বৃদ্ধা মাকটিয়াদীর দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে জলাবদ্ধতা নিরসনে এমপির চিঠিদৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য দেড় কোটি টাকার স্কুল ভবন ৬ বছরেও ব্যবহৃত হয়নিকলমাকান্দায় আগুনে পুড়ল ছয় দোকানমোহনগঞ্জ পাবলিক হাই স্কুলে এডহক কমিটির সভাপতিকে বরণমোহনগঞ্জে চিকাডুবি হাওরে বাঁধের ব্লক নিয়ে তোলপাড়কেন্দুয়ায় ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকেন্দুয়া প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে ইউএনওর মতবিনিময়