Author
৩০ অগাস্ট ২০২৬, ১:৫৭ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে অতিথিশালা, ১৪ বছরেও থাকেননি কোনো পর্যটক

অস্কারজয়ী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটায় পর্যটকদের থাকার জন্য ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে অতিথিশালা নির্মাণ করেছিল সরকার; কিন্তু নির্মাণের পর ১৪ বছর কেটে গেলেও এক রাতের জন্য সেখানে কোনো পর্যটক থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি। অতিথিশালার রেজিস্টারও পুরো ফাঁকা। কোথাও কোনো অতিথির নাম-ঠিকানা নেই।

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নের মসূয়া গ্রামে সত্যজিৎ রায়ের এই পৈতৃক ভিটার অবস্থান। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই বাড়ি দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিনই পর্যটকেরা আসেন; কিন্তু কটিয়াদীতে ভালো আবাসিক হোটেল না থাকায় দূরদূরান্তের পর্যটকেরা রাত্রিযাপন নিয়ে বিপাকে পড়েন। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ২০১১ সালে ভিটার পাশে অতিথিশালা নির্মাণ করে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন।

উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, অতিথিশালা পরিচালনার জন্য পদ সৃষ্টির বিষয়ে পর্যটন করপোরেশন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো চিঠির উত্তরও এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত মূল কাজ হয়নি।

দোতলা অতিথিশালা, সীমানাপ্রাচীর ও রাস্তাঘাট উন্নয়নে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে অতিথিশালা নির্মাণ ও আসবাব কেনায় বরাদ্দ ছিল ৫২ লাখ টাকা। ২০১২ সালের মাঝামাঝি সময়ে অতিথিশালাটি উদ্বোধন করা হয়। এরপর ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও নানা জটিলতায় কখনো কোনো পর্যটক সেখানে রাত কাটাননি।

রেজিস্টারে পর্যটকের নাম নেই

১৩ আগস্ট সরেজমিনে অতিথিশালার প্রধান ফটকে তালা ঝুলতে দেখা যায়। অতিথিশালা দেখভালে কোনো তত্ত্বাবধায়ক না থাকায় মসূয়া ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের ঝাড়ুদার সঞ্জিৎ চন্দ্র দাস সেটি দেখাশোনা করেন। অতিথিশালার পাশেই তাঁর বাড়ি। ডেকে আনার পর সঞ্জিৎ চন্দ্র দাস ফটক খুলে দেন।

অতিথিশালার ভেতরে গিয়ে দেখা গেল, সম্প্রতি রং করা হয়েছে। নিচতলা ও দোতলায় আলাদা খাট, সোফা, তিনটি শৌচাগার ও দুটি ডাইনিং টেবিল। আছে ড্রেসিং টেবিল, আলমিরাসহ প্রয়োজনীয় আসবাব। আইপিএস ও ইন্টারনেট সংযোগও আছে। অতিথিশালার রেজিস্টারে কোনো পর্যটকের নাম পাওয়া গেল না। কোথাও কলমের আঁচড় পড়েনি।

সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটার পাশে নির্মিত অতিথিশালার রেজিস্টার পুরো ফাঁকা। ১৩ আগস্ট তোলা
সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটার পাশে নির্মিত অতিথিশালার রেজিস্টার পুরো ফাঁকা।

সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক বাড়ি দেখতে আসা কোনো পর্যটক অতিথিশালায় রাত কাটিয়েছেন কি না, জানতে চাইলে সঞ্জিৎ বলেন, ‘না’। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের অতিথিরা এক-দুবার থেকেছেন। অতিথিশালায় থাকতে কত টাকা লাগে, সেটিও জানেন না সঞ্জিৎ। তাঁর ভাষ্য, সুযোগ-সুবিধা থাকলে অতিথিরা এখানে থাকতে পারতেন; কিন্তু ব্যবস্থা না থাকায় কাউকে আগ্রহী হতে দেখা যায় না।

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর মসূয়া ইউনিয়নে সত্যজিৎ রায়ের পৈত্রিক ভিটা। সম্প্রতি তোলা ছবি
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর মসূয়া ইউনিয়নে সত্যজিৎ রায়ের পৈত্রিক ভিটা।

দায়িত্ব আছে, লোকবল নেই

অতিথিশালাটি উদ্বোধনের পর উপজেলা প্রশাসনের অধীন ছিল; কিন্তু অতিথিশালা পরিচালনার জন্য কোনো তত্ত্বাবধায়কের (কেয়ারটেকার) পদ সৃষ্টি করা হয়নি। পরে সঞ্জিৎ চন্দ্র দাসকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। অতিথিশালার চাবি তাঁর কাছে থাকে। তবে এই দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি আলাদা কোনো বেতন পান না।

থাকার মানুষ আসে না বলেই এত দিন কেউ থাকেনি। তবে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী সেখানে থেকেছেন। অতিথিশালাটি এখন মেরামত করা হয়েছে। চাইলে যে কেউ থাকতে পারবেন।

শামিমা আফরোজ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, কটিয়াদী

স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, উদ্বোধনের পর দীর্ঘদিন ধরে অতিথিশালাটি দিন–রাত তালাবদ্ধ থাকত। দেখাশোনার লোক না থাকায় একসময় জানালার গ্রিল ও বিদ্যুতের তার চুরি হয়ে যায়। নষ্ট হয়ে যায় আসবাব। পানি সরবরাহের ব্যবস্থাও বিকল হয়ে পড়ে। ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে শৌচাগার। ভবনের পেছনে মাদকসেবীদের আড্ডাও বসত।

কটিয়াদীতে চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটার পাশে নির্মিত অতিথিশালা। সম্প্রতি উপজেলার মসূয়া গ্রামে
কটিয়াদীতে চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটার পাশে নির্মিত অতিথিশালা। সম্প্রতি উপজেলার মসূয়া গ্রামে

জাতীয় বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের আবাসনের প্রয়োজনে অতিথিশালাটি সংস্কার করে ব্যবহার করা হয়। সর্বশেষ ১৬ আগস্ট কটিয়াদী সফরে আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর সফরকে কেন্দ্র করে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের থাকার প্রয়োজন হতে পারে—এমন চিন্তা থেকেই অতিথিশালাটি দ্রুত সংস্কার করা হয়। সঞ্জিৎ চন্দ্র দাস জানান, ‘অতিথিশালায় যা কিছু করা হয়েছে, সবই প্রধানমন্ত্রীর কটিয়াদী সফরকে কেন্দ্র করে।’

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর মসূয়া ইউনিয়নে সত্যজিৎ রায়ের পৈত্রিক ভিটা। সংস্কারের আগের তোলা ছবি
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর মসূয়া ইউনিয়নে সত্যজিৎ রায়ের পৈত্রিক ভিটা। সংস্কারের আগের তোলা

‘জিনিস বানালে হয় না, যত্ন নিতে হয়’

১৩ আগস্ট সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটা দেখতে আসেন কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার দুই বন্ধু সাব্বির আহমেদ ও কবির মিয়া। তাঁরা ভিটার সামনে ছবি তুলছিলেন। অতিথিশালার প্রসঙ্গ তুলতেই কবির বললেন, হাতের কাছে এক গ্লাস পানি পাওয়া যেখানে কঠিন, সেখানে দূরের লোকজনের থাকার ব্যবস্থা করা আরও কঠিন। অতিথিশালাটি দেখিয়ে সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘জিনিস বানালে হয় না, যত্ন নিতে হয়। সেবা দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হয়।’

অতিথিশালা থেকে ৫০ থেকে ৬০ কদম দূরে মসূয়া ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়। অফিস সহকারী আবু নাঈম আকন্দ বলেন, প্রতিদিনই দূরদূরান্তের কেউ না কেউ সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটায় আসেন। তবে ভিটা দেখতে এসে কেউ অতিথিশালায় থেকেছেন বলে তাঁর মনে পড়ে না।

উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, অতিথিশালা পরিচালনার জন্য পদ সৃষ্টির বিষয়ে পর্যটন করপোরেশন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো চিঠির উত্তরও এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত মূল কাজ হয়নি।

চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটার পাশে নির্মিত অতিথিশালা। সম্প্রতি উপজেলার মসূয়া গ্রামে
চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটার পাশে নির্মিত অতিথিশালা। সম্প্রতি উপজেলার মসূয়া গ্রামে

অতিথিশালা নির্মাণের পর কেন দেখাশোনা করার লোক নিয়োগ দিতে আলাদা পদ সৃষ্টি করা হয়নি, তা জানতে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) খালিদ মেহেদি হাসানের সঙ্গে ফোনে কথা হয়। তিনি এ বিষয়ে ব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) আকতার আহমেদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন; কিন্তু আকতার আহমেদের ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ধরেননি।

মসূয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বকর সিদ্দিক বলেন, অতিথিশালা পরিচালনার জন্য লোকবল লাগবে, এটা সরকার জানে না, এটা হতে পারে না। পরবর্তী উপজেলা কমিটির সভায় বিষয়টি তুলে ধরে প্রতিকারের চেষ্টা করবেন বলে জানান।

জানতে চাইলে কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামিমা আফরোজ প্রথম আলোকে বলেন, থাকার মানুষ আসে না বলেই এত দিন কেউ থাকেনি। তবে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী কয়েক দিন আগে সেখানে থেকেছেন। তাঁর ভাষ্য, অতিথিশালাটি এখন মেরামত করা হয়েছে। চাইলে যে কেউ থাকতে পারবেন।

Facebook Comments Box
১ম লাইন রঙ
২য় লাইন রঙ
ফন্ট সাইজ (65px)

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জাহাজ নির্মাণে বিনিয়োগে আগ্রহী মারস্ক

মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-হুইপদের জেলাভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টনের সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে রিট

২০২৮ শিক্ষাবর্ষের কারিকুলামে ব্যাপক সংস্কার আনছে সরকার: মাহদী আমিন

২ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরছেন মির্জা আব্বাস

স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না: গুম প্রতিরোধ দিবসে রাষ্ট্রপতি

প্রতিমন্ত্রীর সামনে যুবলীগ নেতার স্ত্রী-সন্তানদের কান্নাকাটি

১২০০ টন পাথর নিয়ে মেঘনায় ডুবল বাল্কহেড

৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে অতিথিশালা, ১৪ বছরেও থাকেননি কোনো পর্যটক

আপত্তিকর ছবি ছড়ানোর অভিযোগে আটক যুবক, থানায় টাকার বিনিময়ে ‘আপস

এক বেলা খাবারের আশায় প্রতিদিন তাঁদের অপেক্ষা

১০

পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফেরার পথে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণের মামলায় বৃদ্ধ গ্রেপ্তার

১১

পূর্বধলায় দুইবার ভেঙেও জোড়াতালির মেরামত, ঝুঁকিপূর্ণ ত্রিমোহিনী বেইলি সেতু

১২

দাদির সঙ্গে গিয়ে নদে নিখোঁজের ১৮ ঘণ্টা পর শিশুর ভাসমান মরদেহ উদ্ধার

১৩

ত্রিশাল-পোড়াবাড়ী সড়কে অর্ধশত মরা গাছ, দুর্ঘটনার শঙ্কা

১৪

নেত্রকোণা অর্থাভাবে চিকিৎসা বন্ধের পথে এক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর, পাশে দাঁড়ালেন ডেপুটি স্পিকার

১৫

শেরপুর সীমান্তে ৭০৫ বোতল ভারতীয় মদ জব্দ

১৬

বন্যায় প্রাণহানির ঘটনায় বাকৃবিতে নেপালি শিক্ষার্থীদের মোমবাতি প্রজ্বালন

১৭

দেশে সারের সংকট নেই, বেশি দামে বিক্রি করলে ডিলারশিপ বাতিল

১৮

ময়মনসিংহে ইউএনওর বিরুদ্ধে কাজ ছাড়াই ৬০ লাখ টাকার বিল উত্তোলনের অভিযোগ

১৯

ধোবাউড়ায় ভারতীয় ৭ গরু আটক

২০
শিরোনামঃ
জাহাজ নির্মাণে বিনিয়োগে আগ্রহী মারস্কমন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-হুইপদের জেলাভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টনের সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে রিট২০২৮ শিক্ষাবর্ষের কারিকুলামে ব্যাপক সংস্কার আনছে সরকার: মাহদী আমিন২ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরছেন মির্জা আব্বাসস্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না: গুম প্রতিরোধ দিবসে রাষ্ট্রপতিপ্রতিমন্ত্রীর সামনে যুবলীগ নেতার স্ত্রী-সন্তানদের কান্নাকাটি১২০০ টন পাথর নিয়ে মেঘনায় ডুবল বাল্কহেড৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে অতিথিশালা, ১৪ বছরেও থাকেননি কোনো পর্যটকআপত্তিকর ছবি ছড়ানোর অভিযোগে আটক যুবক, থানায় টাকার বিনিময়ে ‘আপসএক বেলা খাবারের আশায় প্রতিদিন তাঁদের অপেক্ষা