‘চোখের সামনে জমিন গিলছে, আমরা শুধু চাইয়া চাইয়া দেখছি। এখন এই যে বাড়িডা আছে, হেইডাও নদ টানতেছে। আর কত ভাঙব, আর কতবার বানামু? আমার সবই শেষ হইয়া গেছে।’
ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন সত্তরোর্ধ্ব আবদুল মান্নান। জীবনে চারবার বসতভিটা হারিয়েছেন তিনি। একসময় তাঁর ছিল ২০ একর জমি। সেই জমিতেই ধান ফলিয়েছেন, ফসল ফলিয়েছেন, সংসার চালিয়েছেন। সন্তানদের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার স্বপ্নও ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নের প্রায় পুরোটাই এখন ব্রহ্মপুত্রের পেটে। শেষ আশ্রয় হিসেবে মেজো ছেলের সঙ্গে যে বাড়িতে থাকছেন, সেটিও এখন ভাঙনের কিনারায়। এরই মধ্যে ভেঙে পড়েছে দুটি ঘর।
স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে খোদাবক্সপুরে প্রায় ১৫০ পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। চলতি বছরই আরও ১৫ থেকে ২০টি পরিবার বাড়িঘর সরিয়ে নিয়েছে। তাঁদের দাবি, অব্যাহত ভাঙনে গ্রামের প্রায় অর্ধেক নদগর্ভে চলে গেছে। এখনো ঝুঁকিতে রয়েছে বহু বাড়িঘর ও কৃষিজমি।
খোদাবক্সপুরে গিয়ে দেখা যায়, অনেক জায়গায় বসতি আর ব্রহ্মপুত্রের মাঝখানে কার্যত কোনো নিরাপদ দূরত্ব নেই। বাড়ির উঠান গিয়ে ঠেকেছে ভাঙনের কিনারায়। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছপালা একে একে নদের দিকে হেলে পড়ছে। কোথাও আবার বসতঘরের পাশের মাটি ধসে পড়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কখন নদ আরও কাছে চলে আসে, কখন পায়ের নিচের মাটি সরে যায়—এ নিয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয়। বিশেষ করে রাতের বেলায় ভাঙনের শব্দ শুনলেই অনেক পরিবার ঘর ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়।
ইতোমধ্যে কেউ কেউ নদের ওপারে জেগে ওঠা চরে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে নতুন করে ঘর তুলেছেন। কিন্তু চর যে স্থায়ী ঠিকানা নয়, সেটিও জানেন তাঁরা। ফলে একবার ভিটা হারানোর পর আবারও নদীর ভাঙনের ঝুঁকি নিয়েই বসতি গড়তে হচ্ছে তাঁদের।
আবদুল মান্নানের মতো একই শঙ্কায় দিন কাটছে মিলিক জানের। সাত বছর আগে স্বামী মারা গেছেন। পাঁচ মাস আগে মারা গেছে তাঁর এক ছেলে। স্বামী রেখে গিয়েছিলেন ২২ কাঠা জমি। সেই জমিও এখন ব্রহ্মপুত্রের ভেতর।
মিলিক জান বলেন, ‘আমার সুখের সংসার আছিন। স্বামী জমিজমা থুইয়া গেছিন। কত ধান হইত, কত ফসল হইত! গোলায় ধান উঠত, বাড়িতে মানুষের আনাগোনা আছিল। জমিন নদ নিয়া গেছে। বাড়ি আছিন, ভাঙছে। গাছপালা আছিন, হেইগুলাও নদের পেটে। অহন সেই জমিন খুঁজলে নদের পানি ছাড়া আর কিছুই দেহা যায় না।’
এই কথার মধ্যেই ফুটে ওঠে নদভাঙনে শুধু জমি হারানোর নয়, একটি পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি ও স্মৃতি হারানোর বাস্তবতা।
ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন শুধু খোদাবক্সপুরেই সীমাবদ্ধ নেই। নদটির তীরবর্তী গৌরীপুরের পাশের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মরিচারচর এবং ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরদড়ি-কুষ্টিয়া, শ্রীকলদীসহ কয়েকটি এলাকাতেও ভাঙন দেখা দিয়েছে।
কোথাও নদগর্ভে চলে যাচ্ছে কৃষিজমি, কোথাও বসতভিটা পড়েছে ঝুঁকিতে। ফলে নদতীরবর্তী এসব এলাকার মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ভাঙনামারী ইউনিয়নের বয়োবৃদ্ধ বাসিন্দা ইদ্রিস আলী বলেন, বর্ষায় ব্রহ্মপুত্রের পানি বাড়লেই ভাঙন তীব্র হয়। এরই মধ্যে গ্রামের অনেক জমি নদে চলে গেছে। আরও অনেক জমি ও বাড়িঘর ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জরুরি ভিত্তিতে কিছু এলাকায় প্রতিরক্ষামূলক কাজ করা হলেও দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর তীররক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছরই নতুন করে ভাঙনের শিকার হচ্ছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, শুধু ভাঙন শুরু হওয়ার পর জিও ব্যাগ বা জিও টিউব ফেলে সাময়িক প্রতিরোধ নয়, নদীর গতিপথ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো বিবেচনায় নিয়ে স্থায়ী তীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
ব্রহ্মপুত্র সুরক্ষা কমিটির সমন্বয়ক আবুল কালাম আল আজাদ বলেন, ‘ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও নদের তীরে বসবাসরত মানুষের নিরাপদ বসতি, কার্যকর তীররক্ষা ও অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। এ জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম হাসনাইন মাহমুদ জানান, প্রায় ২৭০ মিটার এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে জরুরি প্রতিরক্ষা কাজ চলছে।
তিনি জানান, চরদড়ি-কুষ্টিয়ায় প্রায় ৬০ মিটার অংশে জিও টিউব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। চর শ্রীকলদীতে ফেলা হচ্ছে জিও ব্যাগ। খোদাবক্সপুর ও মরিচারচরেও একই ধরনের জরুরি প্রতিরক্ষা কাজ চলছে।
ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোতে স্থায়ী প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে ডিপিপি প্রণয়নের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। এ জন্য একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। খোদাবক্সপুরে ব্লক দিয়ে স্থায়ী তীর সংরক্ষণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
নদভাঙনের পাশাপাশি অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে স্থানীয়দের। তাঁদের অভিযোগ, নদ থেকে বালু উত্তোলনের কারণে কোথাও কোথাও ভাঙনের তীব্রতা বাড়ছে।
ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান গনমাধ্যমকে জানান, গত তিন মাসে দুটি বড় অভিযানে ৪৭টি ড্রেজার ধ্বংস করা হয়েছে। এরপরও রাত ও ভোরে অবৈধভাবে বালু তোলার চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পাশাপাশি মামলা করা হচ্ছে।
তবে প্রশাসনের এসব উদ্যোগের মধ্যেও নদতীরের মানুষের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা থেকে যাচ্ছে পরের ভাঙনটি কোথায় হবে? আবদুল মান্নানের মতো যারা জীবনে একাধিকবার ঘর হারিয়েছেন, তাঁদের কাছে নদভাঙন এখন আর কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি জীবনের সঙ্গে লেগে থাকা এক অনিশ্চয়তা। যে উঠানে একসময় ধান শুকাত, সন্তানদের নিয়ে সংসার চলত, সেই উঠানই এখন ব্রহ্মপুত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
মন্তব্য করুন