ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের অব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ক্যানুলা ও স্যালাইন নগরের শম্ভুগঞ্জ এলাকার একটি বর্জ্য সংরক্ষণাগারে পাওয়া গেছে। এসব চিকিৎসাসামগ্রীর কয়েকটির গায়ে থাকা মেয়াদ অনুযায়ী, সেগুলো ২০২৮ ও ২০৩১ সাল পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য। এ ঘটনায় হাসপাতালের চিকিৎসাসামগ্রী ব্যবস্থাপনা ও বর্জ্য নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় নাগরিকদের কেউ কেউ।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিসহ বিষয়টি প্রকাশের পর আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। বর্জ্য সংগ্রহ ও বাছাইয়ের কাজে যুক্ত শ্রমিকদের দাবি, প্রতিদিনই হাসপাতাল থেকে আসা বর্জ্যের সঙ্গে অব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ক্যানুলা ও স্যালাইন পাওয়া যায়। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব সামগ্রীর কিছু হাসপাতালে ফেরত দেওয়া হয়, আর বাকিগুলো পাইকারি দরে বিক্রি করা হয়। তবে এসব সামগ্রী কীভাবে হাসপাতাল থেকে বর্জ্যের সঙ্গে বাইরে যাচ্ছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান মমেক হাসপাতাল। প্রতিদিন এখানে দুই থেকে তিন হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী না পাওয়ার অভিযোগের মধ্যে মেয়াদ থাকা সামগ্রী বর্জ্যের সঙ্গে বাইরে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগ তৈরি করেছে। এতে সরকারি সম্পদের যথাযথ ব্যবহার, হাসপাতালের মজুত ব্যবস্থাপনা এবং তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শম্ভুগঞ্জের ওই বর্জ্য সংরক্ষণাগারে কয়েক বস্তা সিরিঞ্জ, ক্যানুলা, স্যালাইনসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রী পাওয়া গেছে। সামগ্রীগুলোর গায়ে থাকা মেয়াদ অনুযায়ী, কিছু ২০২৮ সাল এবং কিছু ২০৩১ সাল পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য। তবে এসব সামগ্রী কেন বর্জ্যের সঙ্গে সেখানে এসেছে, তা সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
বর্জ্য সংগ্রহ ও বাছাইয়ের কাজে যুক্ত শ্রমিক জুবেদা খাতুন গণমাধ্যমকে জানান, এ কাজে মোট ১১ জন শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে চারজন মমেক হাসপাতাল থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করেন। বাকি সাতজন শম্ভুগঞ্জের সংরক্ষণাগারে সেগুলো বাছাই করেন।
জুবেদা খাতুনের দাবি, প্রতিদিন বর্জ্যের সঙ্গে নতুন সিরিঞ্জ, ক্যানুলা ও স্যালাইন আসে। এসব সামগ্রী আলাদা বস্তায় রাখা হয়। ১০ থেকে ১২ দিন পর তিন থেকে চার বস্তা জমলে সেগুলো হাসপাতালে ফেরত দেওয়া হয়। অবশিষ্ট সামগ্রী পাইকারি দরে বিক্রি করা হয় বলেও জানান তিনি। তবে এ দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন মমেক হাসপাতাল থেকে ৩৫ থেকে ৪০ ভ্যানগাড়ি বর্জ্য সরানো হয়। এসব বর্জ্য বাছাইয়ের সময় প্রতি সপ্তাহে তিন থেকে কয়েক বস্তা অব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ক্যানুলা, স্যালাইনসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রী পাওয়া যায় বলে জানা গেছে।
হাসপাতালের মজুত থেকে ওয়ার্ডে চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ, অব্যবহৃত সামগ্রী ফেরত নেওয়া এবং বর্জ্য হিসেবে নিষ্পত্তির প্রতিটি ধাপে যথাযথ হিসাব ও নথি সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। এ ঘটনায় সামগ্রীগুলোর উৎস, সরবরাহের হিসাব, ফেরত নেওয়ার প্রক্রিয়া এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকেরা।
নগরের ভাটিকাশর এলাকার বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে অনেক রোগীকে বাইরে থেকে বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রী কিনতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে অব্যবহৃত চিকিৎসাসামগ্রী বর্জ্যের সঙ্গে বাইরে যাওয়ার বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা দরকার। কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।
নাগরিক সংগঠন ময়মনসিংহ মঞ্চের মুখ্য সমন্বয়ক ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেনও এ ঘটনায় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, হাসপাতালের অব্যবহৃত চিকিৎসাসামগ্রী কীভাবে বাইরে যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ও তদারকির বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনা উচিত। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে ঠিকাদার আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ করে বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে হাসপাতালের সিনিয়র স্টোর কর্মকর্তা ডা. ঝন্টু সরকার গণমাধ্যমকে বলেন, অব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ক্যানুলা, স্যালাইনসহ চিকিৎসাসামগ্রী হাসপাতালের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ছুটি শেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ডেকে এ বিষয়ে জবাবদিহি চাওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
মন্তব্য করুন