নেত্রকোনার ছোট বড় ১৩৪ হাওরে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জালে নিধন হচ্ছে বিভিন্ন মাছসহ জলজ প্রাণী। প্রতিটি হাওরে শত শত জালে শেষ হচ্ছে মিঠা পানির মাছ। দুর্গম হাওরে যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে পারছে না। ফলে আসন্ন মৌসুমে মাছের সংকটের আশঙ্কা করছেন স্থানীয় জেলেরা।মৎস্য অধিদপ্তরের প্রচারপত্রে বলা হয়েছে, দেশি প্রজাতির মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য দেশের অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ, যা খাদ্যনিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। অবৈধ চায়না দুয়ারি জাল ব্যবহারে মাছ, পোনা ও অন্যান্য জলজ প্রাণী নির্বিচার ধ্বংস হচ্ছে।চায়না দুয়ারি জাল মাছ ধরার বিশেষ ফাঁদ।
এর দুই পাশে দুয়ার বা প্রবেশপথ রয়েছে। যেখান দিয়ে মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীও প্রবেশ করে, কিন্তু আর বের হতে পারে না। এটি চায়না রিং জাল নামেও পরিচিত। পঞ্চাশ থেকে দুইশো হাত পর্যন্ত লম্বা একেকটি জালে একটু পরপর রিং বসানো থাকে।মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইনে ‘চায়না দুয়ারি জাল’ শব্দবন্ধের উল্লেখ নেই। তবে আইনে বলা আছে, ‘ফিক্সড ইঞ্জিন’ স্থাপন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে
। আইন অনুযায়ী, ‘ফিক্সড ইঞ্জিন’ হলো মাছ ধরার জন্য মাটিতে গেঁথে বা অন্য কোনো উপায়ে স্থিরীকৃত কোনো জাল, খাঁচা, মৎস্য ফাঁদ বা অন্য কোনো মাছ ধরার কৌশল।প্রকাশ্যে বিক্রি হয় চায়না দুয়ারি জাল‘চাইনা রিং জাল পাকাড়ি বাজার’ নামের একটি ফেসবুক পেজে চায়না দুয়ারি জাল বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া যত্রতত্র হাটে বাজারে, জেলা উপজেলা শহরে প্রকাশ্যে বিক্রি হয় চায়না দুয়ারি জাল।খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ২৫ হাত থেকে ১০২ হাত লম্বা চায়না দুয়ারি জালের দাম ১৫ হাজার টাকা থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হয়। হাওর উপজেলার মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী, কলমাকান্দা ও বারহাট্টা উপজেলার হাট বাজারে দিনে রাতে বিক্রি করা হয় এই জাল।এছাড়া ফেসবুক ফেইজে ‘চায়না রিং জাল’ নামেই অনেকগুলো পেজ রয়েছে। এ ছাড়া বিডি ফিশিং গিয়ার্স, চায়না রিং জাল কালেকশন, চায়না রিং জাল বিক্রয় বাজার, চায়না রিং জাল বাজার, চায়না রিং জাল অনলাইন শপ, চায়না রিং জাল পাইকারি বাজার, চায়না রিং জাল হাউজ, চায়না রিং জাল পাইকারি সেল বাজার নামেও পেজ আছে।সেখান থেকেও অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জাল। ইউটিউবেও এই জাল বিক্রি করা হচ্ছে
চায়না রিং জাল নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলে বেশ কয়েকটি ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। এসব ভিডিওতে দেখা যায়, কারখানায় চায়না দুয়ারি জাল প্রস্তুত করা হচ্ছে। হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো ও ফোন নম্বর দেওয়া হচ্ছে। দামও উল্লেখ করা আছে।অবৈধ জাল বিক্রি ঠেকাতে কঠোর বার্তাঅবৈধ এই জালের বিক্রি ও ব্যবহার ঠেকাতে স্থানীয় মৎস্য অধিদপ্তর কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। চায়না জাল তৈরির উপকরণ (জাল ও রিং) সহজলভ্য। তা ছাড়া অধিদপ্তরের জনবলসংকট রয়েছে। তবে কোন কোন উপজেলায় প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় অভিযান চলতে দেখা যায়।মৎস্য অধিদপ্তর গত ১৩ এপ্রিল দেশের সব বিভাগের মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালকদের চিঠি দিয়ে অভিযান বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা বাড়িয়ে অবৈধ চায়না দুয়ারি জালের উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে।
এরপর কিংবা চলতি বছর অধিদপ্তর কত অভিযান বা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে, তার তথ্য নেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরে।স্থানীয় মৎস্য বিভাগ যা বলছেজেলা মৎস্য কর্মকর্তা হারুন-অর-রশিদ বলেন, জেলায় হাওর নদী মিলে চাহিদার অনেক বেশি মাছ উৎপাদন হয়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাছ রপ্তানি করা হয়। নেত্রকোনা জেলার ১০ উপজেলায় ১ লাখ ৮ হাজার মেট্রিকটন মাছের উৎপাদন হয়। আর হাওরাঞ্চলে উৎপাদিত মাছের পরিমাণ প্রায় সাড়ে সাতাশ হাজার মেট্রিকটন।চায়না দুয়ারি জাল ফিক্সড ইঞ্জিনের আওতায় পড়ে এবং এটি অবৈধ বলে জানান জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের মৎস্য কর্মকর্তা মো.হারুন-অর-রশিদ ।তিনি বলেন, এভাবে চলতে থাকলে খাল-বিল, নদী-নালা, হাওর বাঁওড়ে একসময় মাছ পাওয়া যাবে না।
মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী রক্ষায় এই জাল অবৈধ করা হয়েছে।এদিকে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ কেটে মানুষের চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে স্থায়ীভাবে মাছ ধরার অবকাঠামো তৈরির অভিযোগে তিনজনকে ৪৫ হাজার টাকা জরিমানা করে উপজেলা প্রশাসন। এ সময় মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত ৭৮ টি চায়না দুয়ারি জাল জব্দ করে আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়। উপজেলার মুজিবনগর, উদয়পুর ও জাহেরপুর গ্রামের পাশের হাওরে অভিযান চালিয়ে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।অভিযান সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ কেটে মানুষের চলাচলের রাস্তা নষ্ট ও বন্ধ করে, ফসল রক্ষা বাঁধ কেটে সেখানে স্থায়ী স্থাপনা (ফিক্সড ইঞ্জিন) বসিয়ে ভীম জাল দিয়ে মাছ ধরা হচ্ছিল। এতে হাওরের স্বাভাবিক পানি চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নির্বিচারে মাছ ও জলজ প্রাণী নিধনের অভিযোগ ওঠে।পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযান চালিয়ে মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত ৭৮টি চায়না দুয়ারি জাল জব্দ করে। জালগুলো পরবর্তীতে আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়।
একই অভিযানে আইন লঙ্ঘনের দায়ে তিনজনকে মোট ৪৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।স্থানীয়দের অভিযোগ, চায়না দুয়ারি ও ভীম জালের মতো সূক্ষ্ম ফাঁসের জালে বড় মাছের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির ছোট মাছ, পোনা ও জলজ প্রাণীও আটকা পড়ে। এতে হাওরের মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।জানতে চাইলে নেত্রকোনা আবু আব্বাছ কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাজমুল কবীর সরকার বলেন, চায়না দুয়ারি জালটা আমাদের দেশে নিষিদ্ধ। এই জালটা নদী, বিল-ঝিলে ফাঁদ পেতে রাখে।
মৎস্য শিকারিরা মাছ, মা মাছ, মাছের পোনাসহ জলজ উদ্ভিদ সহ সব ধরে ফেলছে। এর ফলে জলাশয়ের যে স্বাভাবিক অবস্থা হুমকিতে পড়বে।তিনি বলেন, হাওর নদী জলাশয়ে মাছ ধরে যারা জীবিকা নির্বাহ করেন তারাও পেশা হারাবে। সর্বোপুরি হাওড়ের মিঠা পানির মৎস্য সম্পদের বিশাল ভাণ্ডার হুমকিতে পরবে।খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. অলিদুজ্জামান বলেন, হাওড়ের ফসল রক্ষা বাঁধ কেটে মানুষের চলাচলের রাস্তা নষ্ট করা এবং স্থায়ী স্থাপনা বসিয়ে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জাল দিয়ে মাছ ধরার সুযোগ দেওয়া হবে না। নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে মাছ নিধনের বিরুদ্ধেও নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।তিনি বলেন, হাওরে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার ও মাছ নিধন বন্ধে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও বলেন, হাওড়ের পানি কমে যাওয়ার কারণে এখন নৌকাতেও যাওয়া যায় না। সড়ক পথেও যাওয়া যায় না। দুর্গম এলাকা হওয়ায় যাওয়া আসা খুব সমস্যা হয়। এজন্য অভিযান চালাতে সমস্যা হয়।
মন্তব্য করুন