দেশ-বিদেশের প্রায় অর্ধলক্ষাধিক পুণ্যার্থীর হাতে জ্বলা মোমবাতির আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে শেরপুরের গারো পাহাড়। আঁকাবাঁকা তিন কিলোমিটারের বেশি পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে তারা অংশ নেন আলোক শোভাযাত্রায়। উদ্দেশ্য, ‘মা মারিয়া’র প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও তার কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা।‘মানবতার জননী ফাতেমা রাণী মা মারিয়া’ মূলসুরে শুরু হয়েছে ২৯তম বার্ষিক তীর্থোৎসব।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার বারোমারী সাধু লিওর ধর্মপল্লীতে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) শুরু হওয়া এ উৎসবে অংশ নেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও বিদেশ থেকে আসা পুণ্যার্থীরা।ধর্মপল্লী সূত্রে জানা যায়, ১৯৪২ সালে প্রায় ৪২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় বারোমারী সাধু লিওর ধর্মপল্লী। ১৯৯৮ সাল থেকে স্থানটিকে বার্ষিক তীর্থস্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
পর্তুগালের ফাতেমা নগরীর আদলে গড়ে ওঠা এ ধর্মপল্লী পাহাড়ের বুকে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। গারো পাহাড়ে আয়োজিত এ তীর্থোৎসব দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ খ্রিস্টান ধর্মীয় সমাবেশ। প্রতি বছর অক্টোবর মাসের শেষ বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার এ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মোমবাতি হাতে আলোক শোভাযাত্রা। বৃহস্পতিবার রাতে পুণ্যার্থীরা মোমবাতি জ্বালিয়ে পাহাড়ি পথ ধরে শোভাযাত্রায় অংশ নেন। রাত ১১টায় মা মারিয়ার মূর্তিকে সামনে রেখে বিশাল প্যান্ডেলে আরাধনা করা হয়।
এরপর রাত ১২টায় নিরাময় অনুষ্ঠান ও নিশি জাগরণের মধ্য দিয়ে প্রথম দিনের ধর্মীয় আয়োজন শেষ হয়। শুক্রবার সকালে জীবন্ত ক্রুশের পথ ও মহাখ্রিস্টযোগের আয়োজন করা হয়।আয়োজক কমিটির সমন্বয়ক ও বারোমারী মিশনের ফাদার তরুণ বানোয়ারী বলেন, আবহাওয়া ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। অন্যবারের তুলনায় এবার ভক্তদের উপস্থিতিও বেশি ছিল। আলোক শোভাযাত্রা, প্রার্থনা, নিশি জাগরণ, জীবন্ত ক্রুশের পথ ও মহাখ্রিস্টযোগসহ নানা ধর্মীয় আয়োজনে অংশ নেন পুণ্যার্থীরা।
এবারের অনুষ্ঠানে প্রধান পুরোহিত ছিলেন ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের বিশপ পনেল পল কুবি সিএসসি।চট্টগ্রাম থেকে পরিবার নিয়ে আসা তীর্থযাত্রী রিসিল মারাক বলেন, ‘আমি পরিবার নিয়ে প্রতিবছর এখানে আসি। মনের আশা পূরণ এবং অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে মা মারিয়ার কাছে প্রার্থনা করি। এতে আমাদের মনোবাসনা পূরণ হয়। গতবার যে আশা নিয়ে প্রার্থনা করেছিলাম, তা পূরণ হয়েছে।’রাজধানীর বনানী থেকে আসা কলেজ শিক্ষার্থী অনন্যা ক্লোরিডা বলেন, ‘আমি রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করি। বান্ধবীদের সঙ্গে এখানে এসেছি। গতবারও এসেছিলাম।
পড়াশোনা শেষ করে যেন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ভালো কিছু করতে পারি, সেই প্রার্থনা করেছি।’ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট থেকে আসা ঘাসুড়িয়া সাংমা বলেন, ‘মা মারিয়ার কাছে এলে মনে এক ধরনের শান্তি পাই। আমরা এখানে প্রার্থনা করি, যেন জীবনের দুঃখ-কষ্ট দূর হয়। এখানে এসে পরিবারের জন্য কিছু কেনাকাটাও করেছি। সব মিলিয়ে বছরে একবার অনেকের সঙ্গে দেখা হয়, এটাও একটা ব্যাপার।’ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের বিশপ পনেল পল কুবি সিএসসি বলেন, ‘আমরা ভক্তরা মা মারিয়ার মাধ্যমে আল্লাহ, ঈশ্বর ও ভগবানের কাছে প্রার্থনা করলে তিনি তা পূর্ণ করেন। মানুষের চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণ করেন। এআই প্রযুক্তি যেন মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়।
বিশ্বে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হোক।’উৎসব ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নিয়োজিত ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। জেলা পুলিশ সুপার একেএম জহিরুল ইসলাম বলেন, প্রায় চার শতাধিক পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্যরা নিরাপত্তায় কাজ করছেন। এ ছাড়া এসআরবি, বিজিবি, আনসারসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করছেন।শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঘিরে প্রায় সাড়ে চারশ পোশাকধারী পুলিশ সদস্য সতর্কতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরাও নিরাপত্তা দিয়েছেন। সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ পরিবেশে তীর্থোৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মন্তব্য করুন