ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে সম্পত্তির বণ্টননামা দলিল করতে গিয়ে জীবিত মাকে মৃত দেখিয়ে এবং এক বোনকে উত্তরাধিকার থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় দলিল লেখক সমিতির সভাপতি মো. মোস্তফা কামাল এবং ভুক্তভোগীর বড় ভাই নুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ করেছেন পরিবারের সদস্যরা।
অভিযোগ রয়েছে, জীবিত মা মোছা. নৈজবুন্নেসাকে মৃত দেখিয়ে এবং মেয়ে ইয়াসমিন খাতুনকে বাদ দিয়ে প্রায় ২ একর ৩৬ শতক জমির বণ্টননামা দলিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে দলিল লেখক সমিতির সভাপতির পদ ও ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে দলিলপ্রতি অতিরিক্ত ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা ফি নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে মোস্তফা কামালের বিরুদ্ধে।
সরেজমিনে জানা যায়, উপজেলার সদর ইউনিয়নের আকনপাড়া এলাকার মৃত রমজান আলী স্ত্রী, ছয় ছেলে ও দুই মেয়ে রেখে মারা যান। পরে তার বড় ছেলে নুরুল ইসলাম জীবিত মা ও এক বোনকে উত্তরাধিকার থেকে বাদ দিয়ে সম্পত্তির বণ্টননামা করার উদ্যোগ নেন বলে অভিযোগ উঠেছে। পুরো প্রক্রিয়ায় দলিল লেখক মো. মোস্তফা কামাল যুক্ত ছিলেন বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জমি রেজিস্ট্রির সময় যে ওয়ারিশ সনদ ব্যবহার করা হয়েছে, সেটিও জাল। এ বিষয়ে সদর ইউনিয়ন পরিষদের রেজিস্টার খাতা যাচাই করে তারা দেখতে পান, ২০২৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ইকরামুল হক খসরুর স্বাক্ষর করা যে স্মারক নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে, ওই নম্বরে প্রকৃতপক্ষে একটি জন্মসনদ দেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগ অনুযায়ী, চলতি বছরের ৪ মে পাঁচ ভাই, মৃত ভাইয়ের স্ত্রী সালমা খাতুন এবং তার দুই ছেলে সাব্বির হাসান ও মেহেদী হাসানের নামে বণ্টননামা দলিল করা হয়। ওই দলিলে জীবিত মা নৈজবুন্নেসা ও মেয়ে ইয়াসমিন খাতুনকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাটি যাচাই করতে সংবাদকর্মীরা অভিযুক্তদের বাড়িতে গেলে দলিলে ‘মৃত’ দেখানো নৈজবুন্নেসাকে জীবিত অবস্থায় দেখতে পান। তিনি তখন ঘরে বসে ভাত খাচ্ছিলেন। সাংবাদিকদের দেখে রসিকতা করে নৈজবুন্নেসা বলেন, “আমি মারা গেলে খাইতেছি কেমনে?”
নৈজবুন্নেসা জানান, দলিল করার সময় তিনি তার মেয়ে ইয়াসমিনের বাড়িতে ছিলেন। পরে জানতে পারেন, দলিলে তাকে মৃত দেখানো হয়েছে। কম্পিউটার অপারেটর অথবা দলিল লেখকের ভুলে এমনটি হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন।
অন্যদিকে পুত্রবধূ সালমা খাতুন বলেন, তার স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তিনি বিপাকে পড়েন। এ কারণে তার ছেলেদের নামে জমি বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে। এ কাজে দলিল লেখক মোস্তফা কামাল সহযোগিতা করেছেন বলেও জানান তিনি।
বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ভুক্তভোগী ইয়াসমিন খাতুন গত ২ জুন উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কাছে লিখিত আবেদন করেন। আবেদনে আকনপাড়া মৌজার ৪৮১, ৪৮২ ও ২৯৫ খতিয়ানের ১৮৫৭, ১৮৭৩, ৭৪, ৭৫ ও ৭৬ দাগে দুই একর ২১ শতক এবং কান্দাপাড়া মৌজার ৩৩ খতিয়ানের ২৭৬ দাগে ১৫ শতাংশ জমির নামজারি ও জমা খারিজ স্থগিতের দাবি জানানো হয়।
ভুক্তভোগী সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, “আমাদের মা জীবিত থাকা সত্ত্বেও ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে প্রায় ২ একর ৩৬ শতক জমি বণ্টন করে নেওয়া হয়েছে। দলিল লেখক সমিতির সভাপতি পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে মোস্তফা কামাল এ কাজে সহযোগিতা করেছেন।” তিনি বিতর্কিত দলিল বাতিল এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
অভিযোগের বিষয়ে দলিল লেখক সমিতির সভাপতি ও দলিল লেখক মো. মোস্তফা কামালের বক্তব্য জানতে ফোন করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর ফোন কেটে দেন। পরে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
হালুয়াঘাট উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার গোলাম সারোয়ার বলেন, জীবিত কোনো ব্যক্তিকে মৃত দেখিয়ে দলিল করার সুযোগ নেই। এমন ঘটনা ঘটে থাকলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন