Author
২২ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৫০ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

চাকরি মেটায় ব্যর্থ, আমাজনে সফল রবিন

ফরিদপুরে জন্ম, নোয়াখালীতে বেড়ে ওঠা পারভেজ এম রবিন এখন আমাজনের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে পাড়ি জমান কানাডায়। এরপর কঠিন ইন্টারভিউর মুখোমুখি হয়ে চাকরি পান আমাজনে। তাঁর পথচলার গল্প শুনে লিখেছেন আজকের পত্রিকার আনিসুল ইসলাম নাঈম

দেশে পারভেজ এম রবিন পড়াশোনা করেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স বিষয়ে। কানাডায় একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেন ডালহৌসি বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে জার্মান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘সিমেন্স এজি’তে দুই বছর কাজ করেন। এরপর বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ই-কমার্স ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আমাজনের কঠিন ইন্টারভিউ ধাপ পেরিয়ে অফার পান। বর্তমানে তিনি আমাজনের কানাডার ভ্যাঙ্কুভার শাখায় ‘সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে কর্মরত।

রবিনের শৈশব

পরিবারে দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় রবিন। পুলিশ কর্মকর্তা বাবা ও গৃহিণী মায়ের সংসারে বেড়ে উঠেছেন তিনি। তাঁর বাবা ছিলেন গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। সময়মতো ঘুম থেকে ওঠা, স্কুলে যাওয়া ও পড়াশোনায় সবার চেয়ে এগিয়ে থাকার বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন। অন্যদিকে মায়ের চোখে ছেলের প্রতিটি কাজ ছিল অনবদ্য। এই বৈপরীত্যের পালে হাওয়া দেয় নোয়াখালীর মফস্বল জীবন। একদিকে দিগন্তজোড়া মাঠ ও ধানখেতের শান্ত সময়। অন্যদিকে পাশ দিয়ে বয়ে চলা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দ্রুতগতির জীবন। শৈশবে তাঁর লক্ষ্য ছিল শিক্ষক হওয়া। একজন আদর্শ শিক্ষক হয়ে একদল আদর্শ মানুষ তৈরিতে ভূমিকা রাখার স্বপ্ন দেখতেন।

সাত স্কুল বদল

বাবার বদলির চাকরির সুবাদে ছেলেবেলায় বহুবার স্কুল বদলাতে হয়েছে রবিনকে। নোয়াখালী থেকে ফরিদপুর, এরপর চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকা; মোট সাতটি স্কুলে পড়েছেন তিনি। পঞ্চম শ্রেণিতে সরকারি বৃত্তি পান। ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ নিয়ে স্কুলজীবন শেষ করেন। একই প্রতিষ্ঠান থেকে এইচএসসি পাসের পর ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পান। তবে তত দিনে মনস্থির করেন, পড়বেন কম্পিউটার সায়েন্সে। সেই সুযোগ আসে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্নাতকের পর স্নাতকোত্তরের জন্য পাড়ি জমান কানাডার ডালহৌসি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের সাহায্যে কম্পিউটার প্রোগ্রামের ত্রুটি শনাক্তকরণ নিয়ে গবেষণা করেন। গবেষণার বিভিন্ন অংশ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং সম্মেলনে প্রকাশিত হয়েছে।

পড়াশোনার বাইরেও সরব উপস্থিতি

পড়াশোনার বাইরেও সরব ছিলেন রবিন। স্কুলজীবনে আবৃত্তি ও উপস্থিত বক্তৃতায় জিতেছেন নানা পুরস্কার। কলেজজীবনে সহলেখক হিসেবে প্রায় আধা ডজন বই প্রকাশনায় যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের প্রকাশনায় নির্মলেন্দু গুণ ও আল মাহমুদের সঙ্গে একটি কবিতার বই উল্লেখযোগ্য।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাবলিক স্পিকিং ক্লাব ‘পোডিয়াম’-এর প্রচার সম্পাদক এবং কম্পিউটার ক্লাব ‘ক্লাস্টার’-এর আইটি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া ডালহৌসি বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট ইউনিয়নের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং কম্পিউটার সায়েন্স ফ্যাকাল্টি কাউন্সিলের শিক্ষার্থী প্রতিনিধি ছিলেন।

জার্মানির সিমেন্স এজিতে

স্নাতকোত্তর শেষে যোগ দেন সিমেন্স এজির ইলেকট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন বিভাগে। এখানে ইলেকট্রনিক সামগ্রী ডিজাইন ও ভেরিফিকেশনের সফটওয়্যার তৈরি হয়। এসব সফটওয়্যারের মূল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ফিচার তৈরির দায়িত্ব ছিল তাঁর দলের। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি হার্ডওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিমেন্সের এই সফটওয়্যারের ক্লায়েন্ট। অর্থাৎ কেউ কয়েক বছর পর যে ফোনটি কিনবেন, তার নকশা ও যাচাইয়ে হয়তো ব্যবহৃত হচ্ছে তাঁদের লেখা কোড। দুই বছর চার মাস কাজের পর এই প্রতিষ্ঠানে ইতি টানেন তিনি।

যেভাবে আমাজনে

আমাজন নিয়ে আলাদা কোনো স্বপ্ন ছিল না রবিনের। প্রতিষ্ঠানটি নিজে থেকে তাঁকে ইন্টারভিউয়ের প্রস্তাব দেয়। তখন সিমেন্স এজিতে তিনটি বড় প্রকল্প সামলানোর ব্যস্ততার মধ্যে প্রস্তুতি নেওয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। প্রক্রিয়া শুরু হয় রিক্রুটারের ফোনকলের মাধ্যমে। এরপর ‘অনলাইন অ্যাসেসমেন্ট’ ধাপে একই দিনে চারটি অংশে পরীক্ষা দিতে হয়। এতে ৪০ মিনিটে একটি ‘লিটকোড-স্টাইল’ প্রোগ্রামিং সমস্যা সমাধান এবং এক ঘণ্টায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় ছয়টি বাগ ফিক্স করতে হয়। এক সপ্তাহ পর শুরু হয় ‘লুপ’ নামের চূড়ান্ত ধাপ। এতে চারটি এক ঘণ্টার ইন্টারভিউ ছিল। প্রতিটিতে প্রোগ্রামিং সমস্যা ও আচরণগত প্রশ্নের মিশেল থাকে; যেমন স্বল্প সময়ে কাজ শেষ করার অভিজ্ঞতা কিংবা ম্যানেজারের সঙ্গে মতবিরোধের ঘটনা। তৃতীয় ইন্টারভিউতে সমস্যাটি ধাপে ধাপে দেওয়া হয়। এতে যাচাই করা হয় প্রার্থী কতটা গুছিয়ে ও রক্ষণাবেক্ষণযোগ্য কোড লিখতে পারেন। চতুর্থ ইন্টারভিউ ছিল ‘সিস্টেম ডিজাইন’ নিয়ে। এতে হাজার হাজার কম্পিউটার একসঙ্গে চালানোর মতো বড় সিস্টেম নকশার দক্ষতা যাচাই করা হয়। পরপর দুই দিনে চারটি ইন্টারভিউ হয়। ইন্টারভিউ শেষ হওয়ার সপ্তাহখানেক পর ৭ জুলাই চাকরির প্রস্তাব পান তিনি। ১০ আগস্ট থেকে আমাজনের সঙ্গে তাঁর পথচলা শুরু।

দিনটি ছিল আনন্দের

আমাজনে চাকরি না হলেও তাঁর তেমন আক্ষেপ থাকত না। তিনি জানতেন, নিজের সেরাটা দিয়েছেন। আমাজনের মতো টেক জায়ান্টে খুব কম মানুষ প্রথমবার ইন্টারভিউ দিয়ে প্রস্তাব পান। এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। খুব বেশি প্রত্যাশা না থাকায় প্রস্তাব পাওয়ার খবরে আনন্দ ছিল তীব্র। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে রবিন বলেন, ‘সেদিন অফিস থেকে বাসায় ফেরার ১৫ মিনিটের ড্রাইভে দুবার ভুল করেছিলাম। ফেরার পর পরিবার ও ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বন্ধুকে জানাই। তারাও ঠিক একই রকম খুশি ছিল।’

মেটায় অপ্রত্যাশিত ব্যর্থতা

২০২৪ সালের শেষ দিকে মেটা থেকেও ইন্টারভিউয়ের ডাক পান রবিন। তখন তিনি বাংলাদেশে। জুম কলে যোগ দেওয়ার দুই মিনিটের মাথায় পাশের ভবনে বিয়ের অনুষ্ঠানের তুমুল হিন্দি গানের শব্দে রিক্রুটারের কথা বোঝা দুষ্কর হয়ে ওঠে। প্রায় পাঁচ মিনিট চেষ্টা করে রিক্রুটার লাইন কেটে দেন। সেখানেই থেমে যায় মেটায় চাকরির সুযোগ। তাঁর ভাষায়, সেই দিনটি ছিল বেশ কষ্টের। তবে পরিবার, বন্ধু ও শিক্ষকদের অটুট আস্থা তাঁকে সব সময় সাহস জুগিয়েছে।

আমাজনে কাজ ও সুযোগ-সুবিধা

আমাজনে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ফিন্যান্সিয়াল মডেলিং প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে কাজ করবেন। এটি বিভিন্ন বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত পুরো কোম্পানিতে কী প্রভাব ফেলবে, তার পূর্বাভাস দেবে। বিশ্বের সর্বোচ্চ বেতনদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আমাজন একটি। সেখানে মেডিকেল ও ডেন্টাল কভারেজ, লাইফ ইনস্যুরেন্স, প্রফিট শেয়ারিং, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, পেনশন, পিতৃত্ব ও মাতৃত্বকালীন ছুটির সুবিধা রয়েছে। মানসিক অবসাদের জন্যও ছুটি দেওয়া হয়। এ ছাড়া আমাজনের কর্মী হিসেবে বিভিন্ন প্রযুক্তি কোম্পানি, এয়ারলাইনস ও রেস্টুরেন্টে বিশেষ ছাড়ের সুবিধাও পাওয়া যায়।

ভবিষ্যতের ভাবনা

রবিন স্রোতের সঙ্গে এগিয়ে চলা মানুষ। তাঁর ধরাবাঁধা কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই। তবে জীবনের কোনো এক বাঁকে হয়তো দেশে ফিরে শিক্ষকতায় মনোনিবেশ করবেন। শুরু থেকে এটিই ছিল তাঁর জীবনের আসল লক্ষ্য। পৃথিবীর নানা প্রান্তে কুড়িয়ে পাওয়া অভিজ্ঞতার আলোকে একদল আদর্শ মানুষ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারবেন—এমন বিশ্বাস তাঁর।

Facebook Comments Box
১ম লাইন রঙ
২য় লাইন রঙ
ফন্ট সাইজ (65px)

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম, দেওয়া হলো গার্ড অব অনার

নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী নির্বাচনী পর্ষদের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

রিজভীর নেতৃত্বে শহীদ জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানালেন জহির উদ্দিন স্বপন

উপকূলের প্রত্যেকটি ঘরে পানির ট্যাংক পৌঁছে দেওয়া হবে : পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী

সচিবালয়ে প্রথমবার অফিস করছেন তথ্যমন্ত্রী আন্দালিব পার্থ, ফুল দিয়ে বরণ

সচিবালয়ে অফিস করছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মঈন খান

বঙ্গভবনে উঠলেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল

পূর্বধলায় আরবানের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ অভিযান-২০২৬ উদ্বোধন

নকলা পৌরসভাধীন বিভিন্ন রাস্তা পরিদর্শন নতুন রাস্তার উদ্বোধন

জামালপুরে ১০০ এতিম শিক্ষার্থী পেল দোস্ত এইড বাংলাদেশ সোসাইটির শিক্ষাবৃত্তি

১০

শেরপুরে গারো বাড়িতে হামলা বিচ্ছিন্ন ও দুঃখজনক ঘটনা: এমপি রুবেল

১১

কলমাকান্দায় ছাত্রদলের কর্মীসভা অনুষ্ঠিত

১২

খেলাধুলায় উৎসাহ দিতে নকলায় ক্রীড়া সামগ্রী বিতরণ

১৩

কেন্দুয়ায় গান, কবিতা ও কথায় বর্ষা

১৪

নকলায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ ।। বর্জ্যই এখন সম্পদ

১৫

আহতদের উদ্ধার করতে গিয়ে প্রাইভেটকারের চাপায় বৃদ্ধ নিহত

১৬

দুর্গাপুরে সংবাদ সম্মেলন ঘিরে পাল্টাপাল্টি দাবি

১৭

ভালুকায় দুর্গন্ধ ছড়াতেই বের হলো অর্ধগলিত লাশ

১৮

বিনামূল্যে চারা পেলেন তারাকান্দার মানুষ

১৯

মেধাবীদের স্বপ্নপূরণে আসপাডার শিক্ষাবৃত্তি

২০
শিরোনামঃ
বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম, দেওয়া হলো গার্ড অব অনারনৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী নির্বাচনী পর্ষদের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রীরিজভীর নেতৃত্বে শহীদ জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানালেন জহির উদ্দিন স্বপনউপকূলের প্রত্যেকটি ঘরে পানির ট্যাংক পৌঁছে দেওয়া হবে : পরিবেশ প্রতিমন্ত্রীসচিবালয়ে প্রথমবার অফিস করছেন তথ্যমন্ত্রী আন্দালিব পার্থ, ফুল দিয়ে বরণসচিবালয়ে অফিস করছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মঈন খানবঙ্গভবনে উঠলেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলপূর্বধলায় আরবানের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ অভিযান-২০২৬ উদ্বোধননকলা পৌরসভাধীন বিভিন্ন রাস্তা পরিদর্শন নতুন রাস্তার উদ্বোধনজামালপুরে ১০০ এতিম শিক্ষার্থী পেল দোস্ত এইড বাংলাদেশ সোসাইটির শিক্ষাবৃত্তি