Author
৮ অগাস্ট ২০২৬, ৮:৫৫ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

বাকৃবির গবেষণা আড়িয়াল বিলের কইসহ ৫ প্রজাতির মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি

বাকৃবির ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান দাবি করেন আড়িয়াল বিলের মাছ, পানি ও পলিমাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ে এটিই প্রথম পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক গবেষণা।

গবেষণায় আড়িয়াল বিলের গাদীঘাট, বসুরোলা ডেঙ্গা, সাগর ডেঙ্গা, বড়াইখালী ও আলমপুর এই পাঁচটি স্থান থেকে ২০২৪ সালের বর্ষা, ২০২৪-২৫ সালের শীত এবং ২০২৫ সালের শুষ্ক মৌসুমে পানি, পলিমাটি ও মাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। মোট ১৫০টি দেশীয় মাছের অন্ত্র, ফুলকা ও মাংসপেশি পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়। পরীক্ষাধীন মাছগুলো ছিল কই, বাটা, মেনি (ভেদা/নান্দিনা), গুলশা টেংরা ও পুঁটি।

গবেষণায় দেখা যায়, কই মাছেই সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হয়েছে। বর্ষা, শীত ও শুষ্ক এই তিন মৌসুমেই কই মাছের মাংসপেশিতে গড়ে প্রায় একটি করে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। অন্ত্রে গড়ে ১ দশমিক ৭০ থেকে ১ দশমিক ৯০ এবং ফুলকায় ১ দশমিক ৩০ থেকে ১ দশমিক ৪০টি কণা শনাক্ত হয়েছে।

কইয়ের পর সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে বাটা মাছে। এরপর রয়েছে মেনি ও গুলশা টেংরা। সবচেয়ে কম শনাক্ত হয়েছে পুঁটি মাছে। গবেষকদের মতে, কই মাছ সর্বভুক হওয়ায় তলদেশের পলি, প্ল্যাঙ্কটন ও অন্যান্য খাদ্যের সঙ্গে মিশে থাকা প্লাস্টিক কণাও সহজে গ্রহণ করে। আবার ৩০০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট কণাগুলো মাছের পরিপাকতন্ত্রের দেয়াল অতিক্রম করে মাংসপেশিতে পৌঁছাতে পারে।

তৃণভোজী বাটা মাছের অন্ত্রে বর্ষা মৌসুমে গড়ে সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৫০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। আর মাংসপেশিতে তিন ঋতুতেই প্রায় একই মাত্রায় (শূন্য দশমিক ৮০ থেকে শূন্য দশমিক ৯০টি) প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।

নান্দিনা বা মেনি মাছের অন্ত্রে শীত ও শুষ্ক মৌসুমে তুলনামূলক বেশি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। তবে মাংসপেশিতে এর মাত্রা ছিল শূন্য দশমিক ৬০ থেকে শূন্য দশমিক ৭০টির মধ্যে। একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে গুলশা টেংরাতেও। এ মাছের অন্ত্রে শীত মৌসুমে সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৩০টি কণা পাওয়া গেছে আর মাংসপেশিতে পাওয়া গেছে শূন্য দশমিক ৫০ থেকে শূন্য দশমিক ৮০টি প্লাস্টিক কণা।

অন্যদিকে ছোট আকারের সর্বভুক পুঁটি মাছে সবচেয়ে কম মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এর মাংসপেশিতে মাত্র শূন্য দশমিক ৫০ থেকে শূন্য দশমিক ৫১টি কণা পাওয়া গেছে।

গবেষণায় প্রতি লিটার পানিতে ১১ থেকে ৩১ দশমিক ৬৭টি এবং প্রতি কেজি পলিমাটিতে ১২ দশমিক ৩৩ থেকে ১২৭ দশমিক ৩৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। বর্ষাকালে পানিতে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি ছিল। গবেষকদের মতে, বৃষ্টির পানির সঙ্গে আশপাশের জনবসতি, বাজার, কৃষিজমি ও নালা-খাল থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য বিলে এসে পড়ে। পরে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে গেলে এসব কণা তলদেশে জমা হয়ে দীর্ঘমেয়াদি দূষণের উৎসে পরিণত হয়।

ফোরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড (এফটি-আইআর) স্পেকট্রোস্কোপি পরীক্ষায় দেখা গেছে, শনাক্ত হওয়া কণার ৩৪ থেকে ৬৩ শতাংশই ছিল মাইক্রোফাইবার। এসব কণার প্রধান উৎস হিসেবে কাপড় ধোয়ার সময় নির্গত কৃত্রিম তন্তু, গৃহস্থালির বর্জ্যপানি এবং মাছ ধরার প্লাস্টিক জালকে দায়ী করছেন গবেষকেরা।

এছাড়া ভাঙা শক্ত প্লাস্টিক, পলিথিনের ফিল্ম ও ফোমজাতীয় কণাও পাওয়া গেছে। রাসায়নিক বিশ্লেষণে পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পলিস্টাইরিন, পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি) এবং পলিকার্বোনেট শনাক্ত হয়েছে, যা প্লাস্টিক ব্যাগ, মোড়ক, বোতল, প্যাকেজিং সামগ্রী ও বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্যে বহুল ব্যবহৃত।

গবেষকেরা বলছেন, আতঙ্ক নয়, এখন প্রয়োজন উৎস থেকেই প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ। তারা নদী ও সংযোগ খালে বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা স্থাপন, নিষিদ্ধ প্লাস্টিক সুতা ও জালের ব্যবহার বন্ধ, উন্মুক্ত প্লাস্টিক বর্জ্যের কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং বিলসংলগ্ন এলাকায় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর সুপারিশ করেছেন।

গবেষণার প্রধান গবেষক এবং বাকৃবির ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান বলেন, “মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন পরিবেশের প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তবে আড়িয়াল বিলের মাছের অন্ত্রের পাশাপাশি মাংসপেশিতেও এর উপস্থিতি পাওয়া যাওয়ায় বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এসব মাছ খেয়ে সরাসরি ক্ষতির প্রমাণ নেই। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে এ ধরনের কণা জমতে থাকলে তার প্রভাব ভবিষ্যতে দেখা দিতে পারে। হয়তো পাঁচ বা দশ বছরে নয়, ২৫ থেকে ৩০ বছর পর কিংবা পরবর্তী প্রজন্মেও এর প্রভাব প্রকাশ পেতে পারে।”

Facebook Comments Box
১ম লাইন রঙ
২য় লাইন রঙ
ফন্ট সাইজ (65px)

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ব্যক্তিগত জীবনের বেদনাকে আমি মানুষের জীবন রক্ষার আন্দোলনে রূপ দিয়েছিলাম: ইলিয়াস কাঞ্চন

রাসায়নিক ব্যবহারে স্বাদ ও ঘ্রাণ হারাচ্ছে মধুপুরের আনারস

শেরপুরে সিএনজি-ভটভটির সংঘর্ষে প্রাণ গেল ১৭ মাসের শিশুর

কিশোরগঞ্জে নিজ খামার থেকে সাবেক পুলিশ সদস্যের মরদেহ উদ্ধার

ময়মনসিংহ মেডিক্যালে হাম উপসর্গে এক শিশুর মৃত্যু

সালিশে মাথা ন্যাড়া করে অপমানের ঘটনায় বিচারের দাবি

নদীতে বিলীন অলওয়েদার সড়ক রক্ষার দায় কার, এলজিইডির নাকি পাউবোর

একটি গ্রামে মাত্র দুটি পরিবার, ১০৭ একরে ১২ মানুষের বসবাস

শেরপুরে জেলা প্রশাসকের সহায়তায় আলুচাষির অস্ত্রোপচার

বাকৃবির গবেষণা আড়িয়াল বিলের কইসহ ৫ প্রজাতির মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি

১০

ট্রেনের ৫ বগি লাইনচ্যুত, ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ

১১

ময়মনসিংহে হত্যা মামলায় দুই আসামি গ্রেপ্তার

১২

ময়মনসিংহে চোরাচালানের কম্বলসহ ৪ জন গ্রেপ্তার

১৩

নকলায় সিএনজি-ভটভটি সংঘর্ষে শিশুর মৃত্যু

১৪

নকলায় দুস্থদের মাঝে আর্থিক সহায়তার চেক বিতরণ

১৫

পিতা-মাতাকে মারধরের অভিযোগে যুবকের কারাদণ্ড

১৬

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে ইমাম-মোয়াজিনদের পাশে এমপি হিলালী

১৭

বারহাট্টায় পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের অভিযোগে বৃদ্ধ আটক

১৮

মসজিদে যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১

১৯

নেত্রকোনায় তরুণী ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি রিপন মিয়া র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার

২০
শিরোনামঃ
ব্যক্তিগত জীবনের বেদনাকে আমি মানুষের জীবন রক্ষার আন্দোলনে রূপ দিয়েছিলাম: ইলিয়াস কাঞ্চনরাসায়নিক ব্যবহারে স্বাদ ও ঘ্রাণ হারাচ্ছে মধুপুরের আনারসশেরপুরে সিএনজি-ভটভটির সংঘর্ষে প্রাণ গেল ১৭ মাসের শিশুরকিশোরগঞ্জে নিজ খামার থেকে সাবেক পুলিশ সদস্যের মরদেহ উদ্ধারময়মনসিংহ মেডিক্যালে হাম উপসর্গে এক শিশুর মৃত্যুসালিশে মাথা ন্যাড়া করে অপমানের ঘটনায় বিচারের দাবিনদীতে বিলীন অলওয়েদার সড়ক রক্ষার দায় কার, এলজিইডির নাকি পাউবোরএকটি গ্রামে মাত্র দুটি পরিবার, ১০৭ একরে ১২ মানুষের বসবাসশেরপুরে জেলা প্রশাসকের সহায়তায় আলুচাষির অস্ত্রোপচারবাকৃবির গবেষণা আড়িয়াল বিলের কইসহ ৫ প্রজাতির মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি