রিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরকে কেউ সনদ দেখাতে ব্যর্থ। কারও সনদ ভুয়া। কেউ আবার মাসের পর মাস ছুটিতে। কারও হয়ে প্রক্সি ক্লাস নিচ্ছেন অন্যজন। নিয়মিত বেতন-ভাতাও তুলছেন তারা। এসব অনিয়ম-দুর্নীতির কেন্দ্রে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার খাগাটি জামতলী ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আলী ফরায়েজী রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই বিষয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর ময়মনসিংহের উপপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সাবেক অভিভাবক সদস্য শাহজাহান কবীরের দেওয়া লিখিত অভিযোগে বলা হয়, ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাটির লেখাপড়ার মান ও শৃঙ্খলা বর্তমান অধ্যক্ষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের কারণে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। কমে যাচ্ছে শিক্ষার্থী।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মাদ্রাসাটির আরবি বিভাগের প্রভাষক জুলহাস উদ্দিন ভুয়া নিবন্ধন সনদ দিয়ে নিয়োগ পান। এ বিষয়ে প্রতিবেদন চায় পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। ২০১৪ সালের ১৬ জুন ডিআইএর একটি দল পরিদর্শনে আসে। পরে তার নিবন্ধন সনদ অপ্রদর্শিত হলে অধ্যক্ষের কাছে প্রতিবেদন চাওয়া হয়। বিষয়টি ধামাচাপা দিতে অধ্যক্ষ ২০১৫ সালের ১৪ মে নিরীক্ষা অধিদপ্তরে জানান, জুলহাস উদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু তিনি এখনও কর্মরত। প্রতিষ্ঠানের এমপিও কপি সংগ্রহ করে সমকাল। এতে দেখা যায়, সর্বশেষ সেপ্টেম্বর মাসের বেতন-ভাতাও তুলেছেন তিনি।
তবে প্রভাষক জুলহাস উদ্দিন বলেন, ‘নিরীক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালে হাইকোর্টে আপিল করেছি। এরপর থেকে আমার বেতন-ভাতা চালু রয়েছে।’
সহকারী মৌলবি মোছা. রাবিয়া খাতুনের নিবন্ধন সনদ ডিআইএর নিরীক্ষার সময় প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হলে একইভাবে ধামাচাপা দেন অধ্যক্ষ। ২০১৪ সালের ১৬ জুন ডিআইএর একটি দল পরিদর্শনে গেলে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে নিবন্ধন সনদ অপ্রদর্শিত অবস্থায় পান। ২০১৫ সালের ১৪ মে দেওয়া প্রতিবেদনে ওই শিক্ষক পদত্যাগ করেছেন বলে জানানো হলেও রাবিয়া খাতুন এখনও কর্মরত। তিনিও নিয়মিত বেতন-ভাতা তুলছেন।
এ ছাড়া সহকারী মৌলবি সোহেল মিয়া এনটিআরসিএর চাহিদাতে চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তিতে কোনো আবেদন ছাড়াই ভুয়া সনদ দিয়ে সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সর্বেশষ বেতন শিটেও তার নাম রয়েছে। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তির আবেদন প্রকাশ হলে এই পদে এনটিআরসিএর সনদধারী অনেকেই আবেদন করেন। কিন্তু সেই গণবিজ্ঞপ্তির ফল প্রকাশের আগেই তাকে নিয়োগ দেখানো হয়।
সহকারী মৌলবি সোহেল মিয়ার ভাষ্য, তিনি তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তিতে নিয়োগ পেয়েছেন। তবে তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তিতে নিয়োগ পেলে কীভাবে চতুর্থ গণবিজ্ঞপ্তিতে তার পদ শূন্য দেখানো হলো? এ বিষয়ে কোনো উত্তর দিতে পারেননি তিনি।
এসব অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্তে নামে এনটিআরসিএ। সেখান থেকে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ বরাবর পত্র পাঠানো হয়। চিঠির জবাব যথাযথ হয়নি মর্মে পুনরায় তদন্ত করার জন্য এনটিআরসিএ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর ময়মনসিংহের উপপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে ময়মনসিংহ জেলা শিক্ষা অফিস তদন্ত করে প্রভাষক জুলহাস উদ্দিন ও সহকারী মৌলবি সোহেল মিয়ার বিরুদ্ধে সনদ জালিয়াতির সুস্পষ্ট প্রমাণ পায়।
মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষক জানান, সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে ম্যানেজ করার কথা বলে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এই দুই শিক্ষকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়েছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
এ ছাড়া সপ্তম গণবিজ্ঞপ্তিতে নিয়োগ পাওয়া ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক জান্নাতুল মুনমুন প্রতিষ্ঠানে যোগদানের পরদিনই ৬ মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি নেন। এই ছুটি শেষ করার এক মাস পরে যোগদান করেই আবার দীর্ঘদিন অনুপস্থিত আছেন। অভিযোগ আছে, প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে তার স্থলে পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে নিলুফা নামে একজনকে দিয়ে পাঠদান করানো হচ্ছে। কিন্তু প্রভাষক জান্নাতুল মুনমুন নিয়মিত বেতন-ভাতা তুলছেন। শিক্ষকদের অভিযোগ, অনেক বছর আগে থেকেই প্রতিষ্ঠানে আরও অনেকের ক্ষেত্রেই একজনের চাকরি আরেকজন করার রেকর্ড আছে।
অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আলী ফরায়েজী মাসের পর মাস নিয়মিত প্রতিষ্ঠানে আসেন না। তিনি মুভমেন্ট রেজিস্টার বা ছুটির আবেদন জমা না রেখে পরবর্তী সময়ে একদিনেই পুরো মাসের সব হাজিরা স্বাক্ষর করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অনিয়মের বিষয়ে অধ্যক্ষ মুহাম্মদ আলী ফরায়েজীর ভাষ্য, অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে। ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের। প্রভাষক জান্নাতুল মুনমুন বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ছুটিতে আছেন। তার বদলে আরেকজন প্রক্সি শিক্ষক হিসেবে ক্লাস নিচ্ছে বলে স্বীকার করেন তিনি। নিয়মিত প্রতিষ্ঠানে না আসার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমি মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল, আমার বাহিরে অনেক কাজ থাকে। আমি সপ্তাহে ২-৩ দিন মাদ্রাসায় যাই।’
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর ময়মনসিংহের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহা. নাসির উদ্দীন জানান, মাদ্রাসাটির শিক্ষকদের সনদ জালিয়াতির ব্যাপারে বেশ কয়েকটি অভিযোগের তদন্ত চলমান রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের তদন্তেও বেশ কিছু অসঙ্গতি ধরা পড়েছে। তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন