দিনে আটটি ক্লাসের বদলে হচ্ছে এক থেকে দুটি। সাড়ে ছয় হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীর ইংরেজি পাঠদানের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন মাত্র দুজন শিক্ষক। শিক্ষক সংকটের কারণে শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে বাধ্য হয়ে প্রাইভেট ও কোচিংয়ের দিকে ঝুঁকছেন শিক্ষার্থীরা।
এমন চিত্র দেশের অন্যতম পুরোনো বিদ্যাপীঠ নেত্রকোনা সরকারি কলেজের। কেবল ইংরেজি বিভাগেই নয়; গণিত, রসায়নসহ অন্যান্য বিভাগেও তীব্র শিক্ষক স্বল্পতায় স্থবির হয়ে পড়েছে সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রম।
নেত্রকোনা সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী খুসবো তারান্নুম। তার প্রতিদিন আটটি ক্লাস হওয়ার কথা। কিন্তু শিক্ষক সংকটের কারণে নিয়মিত এক থেকে দুটির বেশি ক্লাস হয় না। চতুর্থ বর্ষের ইমরান আহমেদের ৯টি ক্লাস হওয়ার কথা থাকলেও গড়ে ক্লাস হয় একটি। ফলে ইংরেজির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে পাঠদানে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি।
ইংরেজির শিক্ষক মাত্র দুজন
শুধু তারান্নুম বা ইমরান নন, তাদের মতো একই সমস্যা বিভাগের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থীর। একই সমস্যায় পড়তে হয় একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণির পাশাপাশি ডিগ্রি এবং কলেজে চালু থাকা ১৪টি বিষয়ের অনার্সের (সম্মান) শিক্ষার্থীদের। কেননা, অনার্সের শিক্ষার্থীরা যে বিষয়েই পড়ুন না কেন, তাদের ১০০ নম্বরের ইংরেজি বাধ্যতামূলক।
কলেজটিতে ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকের চারটি পদ রয়েছে। এর মধ্যে সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকের পদ দুটি প্রায় আট বছর ধরে শূন্য। ফলে দুজন শিক্ষককে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার শিক্ষার্থীর ক্লাস নিতে হয়।
ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক কাজী আশরাফুন হুমায়রা জাগো নিউজকে জানান, বিভাগে একজন শিক্ষক সংযুক্ত আছেন। বাইরে থেকে তিনজন অতিথি শিক্ষক এনে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে। তারপরও প্রয়োজন মেটানো যাচ্ছে না।
তার হিসাবে, ইংরেজি সম্মান শ্রেণিতে প্রতিদিন ২৭টি, স্নাতকোত্তরে সাতটি এবং উচ্চমাধ্যমিক, ডিগ্রি ও অন্যান্য পর্যায়ে ক্লাসও রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩৯টি ক্লাসের প্রয়োজন হয়। এতে কম করে হলেও ১২ জন শিক্ষক দরকার।
কলেজে সব মিলিয়ে ইংরেজি পড়ুয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা সাড়ে ছয় হাজারের বেশি বলে জানান বিভাগের ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্বে থাকা প্রভাষক রানা আহমেদ।
তিনি বলেন, ‘স্নাতক ও স্নতকোত্তরের শিক্ষার্থীদের পাঠদানের জন্য বাইরে থেকে ভালো অতিথি শিক্ষকও পাওয়া যাচ্ছে না। নিজেদের খারাপ লাগে। শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ পাঠ আমরা দিতে পারছি না।’
শুধু ইংরেজি নয়; গণিত, প্রাণিবিদ্যা, রসায়নসহ অন্যান্য বিভাগেও প্রায় একই চিত্র। গণিত বিভাগে অনুমোদিত চারটি পদের বিপরীতে শিক্ষক আছেন দুজন। উচ্চমাধ্যমিক ও বিএসসি মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থীকে তাদের পড়াতে হয়।
গণিত বিভাগের প্রভাষক শাহীজুল ইসলাম বলেন, তিনি ও রাজীব শেখ দুজনে পড়াতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন। শিক্ষক কম থাকায় নিয়মিত ক্লাস নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এতে শিক্ষার্থীর উপস্থিতিও কমে যাচ্ছে।
প্রাণিবিদ্যাতেও চারটি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন দুজন শিক্ষক। এছাড়া কিছু বিষয়ে বাইরে থেকে অতিথি শিক্ষক এনে ক্লাস করাতে হচ্ছে।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, একাদশ শ্রেণি থেকে শুরু করে ১৪টি বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তরসহ অন্তত ১৫ হাজার ৪৫৪ জন শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠানটিতে লেখাপড়া করছেন। শিক্ষক সংকটসহ নানান সংকটের মধ্য দিয়ে তাদের পড়াশোনা করতে হচ্ছে। কলেজটিতে শিক্ষক প্রয়োজন ২৩৭ জন। অথচ অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ বাদে অনুমোদিত শিক্ষকের পদ রয়েছে মাত্র ৬৫টি। এর মধ্যে প্রভাষকের ১০টি, সহকারী অধ্যাপকের সাতটি, সহযোগী অধ্যাপকের ১০টি, অধ্যাপকের দুটিসহ ২৯টি পদই শূন্য। অর্থাৎ বর্তমানে কর্মরত শিক্ষক মাত্র ৩৬ জন।
কলেজের উপাধ্যক্ষ মো. আবদুল কাদির ফকির জানান, নেত্রকোনা সরকারি কলেজের মতো কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল সরকারি কলেজ, জামালপুরের আশেক মাহমুদ কলেজসহ সমপর্যায়ের বিভিন্ন কলেজে প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষকের পদ সৃষ্টি হয়েছে। অথচ নেত্রকোনা সরকারি কলেজে হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
যা বলছে কর্তৃপক্ষ
কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবু তাহের খান জাগো নিউজকে বলেন, শিক্ষক সংকট দূর করতে ১৭০টি নতুন শিক্ষক পদ সৃষ্টির প্রস্তাব প্রায় দুই বছর আগে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে শিক্ষক সংকট অনেকটাই কমবে। ছেলেদের জন্য ছয়তলা একটি আবাসিক হলের অনুমোদন হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে জানতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। তবে যুগ্ম সচিব জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টি জানা আছে। এ নিয়ে কাজ চলছে। আশা করা যায় শিগগির সমাধান হবে।’
মন্তব্য করুন