সেই বৃদ্ধ বললেন, হেই থাইক্কা আসকা মাইরা শইল বেহুঁশ হইয়া যায়

24
সেই বৃদ্ধ বললেন, হেই থাইক্কা আসকা মাইরা শইল বেহুঁশ হইয়া যায়ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার কাশিগঞ্জ বাজার থেকে বৃদ্ধ হালিম উদ্দনের সম্প্রতি তোলা ছবি: সংগৃহীত

নিজস্ব প্রতিবেদক : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি জোরপূর্বক এক বৃদ্ধের চুল কেটে দিচ্ছে। ওই সময় বয়স্ক মানুষটি অনেকক্ষণ চেষ্টা করেন নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে। না পেরে শেষ পর্যন্ত অসহায় আত্মসমর্পণ করে বলেন, ‘আল্লাহ, তুই দেহিস’।

ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা থানার কাশিগঞ্জ বাজার সংলগ্ন কোদালিয়া গ্রামের ষাটোর্ধ হালিম উদ্দিন আকন্দের সঙ্গে গত ৪ মাস আগে এ ঘটনা ঘটে। তবে ঘটনাটি সম্প্রতি ভাইরাল হলে এটি আলোচনায় আসে।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, একজন বয়স্ক ফকির লাঠি ও ব্যাগ হাতে একটি দোকানের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন। তার মুখে দাড়ি এবং মাথায় ছিল জটা পাকানো লম্বা চুল। হঠাৎ তিনজন ব্যক্তি তাকে ধাওয়া করে এবং জোর করে টেনে-হিঁচড়ে রাস্তার পাশে নিয়ে যায়। শারীরিক শক্তি দিয়েও তিনি নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি।

চুল কাটার সময় অসহায় বৃদ্ধটি বারবার আকুতি জানানোর পাশাপাশি কান্নায় ভেঙে পড়েন। সেই মুহূর্তে তার ‘আল্লাহ, আল্লাহ তুই দেহিস’— এই আকুতি মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেয়। তবে সেই তিন ব্যক্তি তার আর্তনাদে কর্ণপাত না করে জোরপূর্বক মাথার সব চুল কেটে দেন।

ভুক্তভোগী হালিম উদ্দিন সমকালকে জানান, ঘটনার দিন সকালে তিনি স্থানীয় বাজারে চায়ের দোকানে বসেছিলেন। হঠাৎ কয়েকজন লোক তাকে চা নাশতা খাওয়ার জন্য জোড় করে। তাতে রাজি না হওয়ায় তাকে বাইরে এনে ৩-৪ জন মিলে ট্রিমার দিয়ে চুল দাড়ি কেটে দেয়।

কান্নাজড়িত কন্ঠে তিনি আরও বলেন, সিলেটের হযরত শাহজালালের মাজারে যাওয়ার পর থেকে তিনি কোনদিন চুল কাটেননি। তার চুলের বয়স ছিল আনুমানিক ৩০ বছর। হঠাৎ করেই এই ব্যক্তিরা জোর করে চুল কেটে দেওয়ায় তিনি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছেন।

চুল ধরে কেটে দেওয়ার পর বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছেন বলেও জানান তিনি। বিশেষ করে হাত পাসহ বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ব্যথাসহ বিভিন্ন জটিলতায় ভোগছেন।

সেই ঘটনার শারীরিক ও মানসিক আঘাত এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি বৃদ্ধ হালিম উদ্দন। বাইরে বের হতে অস্বস্তি বোধ করেন। তিনি বলেন, ‘হেই থাইক্কা আমি কামকাজ করতে পারি না, বাজারে আইতারি না, ঘরবৈঠক আমি। রোগী ঝাড়তে পারি না। আসকা মাইরা শইল বেহুঁশ হইয়া যায়, মাথাত পানি ঢালন লাগে (হঠাৎ হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়েন, মাথায় পানি ঢালতে হয়)।’

যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের বিচার চান কিনা এ বিষয়ে জানতে চাইলে হালিম উদ্দিন জানান, তাদের বিচার আল্লাহ করবে। সামাজিকভাবে আমি অনেক হেয় প্রতিপন্ন হয়েছি। সারা বিশ্বের লোক আমাকে দেখেছে। বিষয়টি নিয়ে আমি খুবই মর্মাহত হয়েছি।

স্থানীয় বাসিন্দা হাসিবুদ্দিন জুয়েল জানান, একটি হিউম্যানিটি সংস্থার কয়েকজন টুপি দাড়িওয়ালা লোক এসে জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে হালিম উদ্দিনের লম্বা চুলদাড়ি কেটে দেয়। এ সময় বাজারে শত শত লোক তাকিয়ে দেখছিল। কিন্তু কেউ তার সাহায্যে এগিয়ে আসেনি।

হালিমের বড় ছেলে হাবিব জানান, আমার বাবা দীর্ঘদিন যাবত চুল দাড়ি কাটেন না। এতে তার কোন সমস্যা হতো না। সম্প্রতি ঢাকা থেকে কিছু লোকজন এসে জোর করে তার জটলা চুল দাড়ি কেটে দেয়। বর্তমানে তিনি লজ্জায় ঘর থেকে খুব একটা বের হন না। এছাড়াও শারীরিক ও মানসিকভাবে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ময়মনসিংহ জজ কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাজাহান কবির সমকালকে বলেন, ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং লোকশিল্পের ধারক-বাহক হালিম ফকিরের ওপর যে বর্বরোচিত ঘটনা ঘটেছে, তা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং দুঃখজনক। সংস্কৃতিমনা যেকোনো মানুষের জন্য এটি গভীর উদ্বেগের বিষয়।

ময়মনসিংহ জেলার বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম আসলাম সমকালকে বলেন, আইনের দৃষ্টিতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দ্বারা এভাবে কাউকে জোর করে হেনস্তা করা বা শারীরিক ও মানসিকভাবে আঘাত করা গুরুতর অপরাধ। এটি কেবল ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থি এবং সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টির অপপ্রয়াস।

এদিকে এক বিবৃতিতে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এই ঘটনাকে ‘সম্পূর্ণ অমানবিক, বেআইনি এবং সংবিধান ও মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে উল্লেখ করেছে।

আসক জানায়, এই কাজ কেবল ভুক্তভোগীর মৌলিক অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার লঙ্ঘন নয়, বরং এটি তার মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত। এ ধরনের ঘটনা সমাজে ভীতি, আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি করছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১ অনুযায়ী, প্রতিটি নাগরিককে আইনের আশ্রয়ে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার দিয়েছে। অনুচ্ছেদ ৩২ অনুযায়ী, জীবনের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করে এবং অনুচ্ছেদ ৩৫-এ কারও প্রতি নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

তারাকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ টিপু সুলতান সমকালকে জানান, বৃদ্ধ হালিম ফকির এলাকায় কবিরাজি করেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে গত ঈদুল আজহার আগে কয়েকজন লোক ঢাকা থেকে এসে তার চুল কেটে গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পরিয়ে দিয়ে চলে যান। স্থানীয়রা ওই লোকদের চিনতে পারেনি।

তিনি আরও জানান, জানতে পেরেছি, ঢাকা থেকে আসা লোকগুলো ইউটিউবার। তারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে পাগল ও বয়স্কদের জোর করে চুল দাড়ি কেটে দিয়ে ভিডিও করে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোন অভিযোগ আসেনি। তবে ভুক্তভোগীর বাড়িতে আমরা পুলিশ পাঠিয়েছিলাম। এ ঘটনায় যারা জড়িত তাদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here