ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। মৃত্যুও ঘটতে শুরু করে। পরিস্থিতি সামলাতে ২৪ মার্চ হাম আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য তিনটি পৃথক মেডিকেল টিম গঠন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের তিনটি পৃথক কক্ষ করা হয় হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য। ১০ শয্যা বিশিষ্ট কক্ষ গুলো হাম/মিসেলস কর্ণার নামে মেডিকেল টিমের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছে শিশুদের।
হাসপাতালের শিশু বিভাগের ৩টি ওয়ার্ডে রবিবার (২৯ মার্চ) দুপুর পর্যন্ত ৩৬ জন শিশু রোগী হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছে। আর চলতে মাসে চিকিৎসা সেবা নিয়েছে মোট ১০৬ জন রোগী।
হাসপাতালের ৩০ নাম্বার ওয়ার্ডের ১ বছর বয়সী নেত্রকোনার কলমাকান্দার কামরুল ইসলামের ছেলে কাজল চিকিৎসা নিচ্ছে। শুক্রবার (২৭ মার্চ) ছেলেকে নিয়ে ভর্তি হন। কামরুল ইসলাম জানান, একসপ্তাহ আগে ঠান্ডা সর্দি জ্বর দেখা দেয় কাজলের। স্থানীয় চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা চলছিল। এর মধ্যে তিন দিন আগে শরীরে হাম দেখা দেয়। পরে গত শুক্রবার হাসপাতালে এসে ভর্তি হয়েছি। এখন চিকিৎসা চলছে। আশা করছি শীঘ্রই সে ভালো হবে।
ময়মনসিংহের গৌরীপুরের কলাদিয়া গ্রামের সাড়ে ৮ মাস বয়সী ছেলে মুসাকে নিয়ে শনিবার ভর্তি হয়েছেন শাহানাজ বেগম। তিনি জানান, ছেলের জন্মের পর সবগুলো টিকা দিয়েছি, কিন্তু এরপরও হাম বের হল এটা বুঝতে পারছি না। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেছি।
হাসপাতালের শিশু বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডাক্তার বিজন কুমার জানান, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় রোগীর হাঁচি-কাশি, কথা বলা বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে এই ভাইরাস দ্রুত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। হামের জটিলতা থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখে ও মাথায় প্রদাহসহ বিভিন্ন রোগে শিশুরা আক্রান্ত হয় ও মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হয়। হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের মধ্যেও নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ অন্যান্য লক্ষণ গুলো রয়েছে।
শিশু বিভাগের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের সহকারী অধ্যাপক ডা. বিশ্বজিৎ চৌধুরী জানান, হামের টিকা নিয়েছে এবং নেয়নি দুধরণের রোগীই আমরা পাচ্ছি। এখন পর্যন্ত কোনো রোগীকে আইসিইউতে পাঠানোর মতো পরিস্থিতি হয়নি। কয়েকমাস ধরে এক-দুজন রোগী পাওয়া গেলেও এ মাসেই বেশি রোগী পাওয়া যাচ্ছে। রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তিনটি পৃথক কর্ণার করা হয়েছে। কৃষক নার্স এবং কর্মচারীরা সাধ্যমত চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউনিট-২ এ নার্স হিসেবে কর্মরত আছেন মোমেনা খাতুন। হাসপাতালের নথিপত্র ঘেঁটে চলতি মাসে ভর্তি হওয়া হাম আক্রান্ত রোগী ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান জানান তিনি। দুটি ওয়ার্ডের তিনটি ইউনিটের খাতাপত্র ঘেঁটে তাঁর দেওয়ার তথ্য অনুযায়ী চলতি ১৮ মার্চ থেকে হাম আক্রান্ত রোগীদের তথ্য তারা পৃথকভাবে সংরক্ষণ করছেন। এর মধ্যে ১৮ মার্চ ওয়াজকুরুনী নামে ৪ মাস বয়সী এক শিশু হাম আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। শিশুটি জেলার গৌরীপুরের কলতাপাড়া এলাকা থেকে ভর্তি করা হয়েছিল ১৫ মার্চ। ২৬ মার্চ ময়মনসিংহ নগরের নওমহল এলাকায় তনুসা নামে ৩ বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়। একই দিন সামিয়া নামে ২ বছর বয়সী আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়। এই শিশুটিকে পুলিশ লাইন্স এলাকা থেকে ভর্তি করা হয়েছিল।
শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. আক্তারুজ্জামান জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী সাধারণ রোগী থেকে হাম আক্রান্ত রোগীদের আলাদা করে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আপাতত তিনটি কক্ষে রোগীদের রাখা হচ্ছে । তিনি আরও জানান, সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) লোকজন এই হাসপাতালে এসে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করছে। কিন্তু কী কারণে হঠাৎ হাম আক্রান্ত রোগী বেড়ে গেল তা বুঝা যাচ্ছো না। তবে শিশুদের টিকাদানে সমস্যা হওয়ার কারণে এমনটি হতে পারে। আক্রান্ত রোগী থেকে অন্যদের দূরে রাখতে হবে ও সাবধানে থাকতে হবে। এই রোগটি অত্যন্ত ছোঁয়াছে জানান তিনি।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. জাকিউল ইসলাম জানান, হাম আক্রান্ত রোগী হঠাৎ করে বেড়েছে আগে এ ধরণের রোগী কখনোই দেখা যায়নি। স্বাস্থ্য সেবা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আমরা তিনটি আলাদা কর্ণার চালু করেছি যাতে সাধারণ রোগীদের সংস্পর্শে না যায়। প্রকোপ ধীরে ধীরে কমে আসুক আমরা সেটা চাই। ব্যাপকভাবে হলে আমাদের জায়গা না থাকলেও আইসোলেশনের জায়গাটি বাড়ানো হবে জানান তিনি।
এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালে ময়মনসিংহ জেলা ছাড়াও শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল, কুড়িগ্রাম, কিশোরগঞ্জ ও গাজীপুর থেকে রোগী এসে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা সেবা নিয়ে থাকে।


