Author
১৭ অগাস্ট ২০২৬, ১১:১৮ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

নরসুন্দরদের হাট ভালুকায় বটগাছের নিচে টিকে আছে শতবছরের ঐতিহ্য

শনিবার (১৫ আগস্ট) বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আধুনিকতার ছোঁয়ায় চারপাশের জীবনযাত্রা বদলে গেলেও মল্লিকবাড়ী বাজারের বটতলার এই নরসুন্দরদের হাট এখনো টিকে আছে পুরোনো ঐতিহ্য আঁকড়ে। প্রতি শনিবার বসা সাপ্তাহিক হাটের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে এই বটতলা।

শহর ও গ্রামজুড়ে এখন অসংখ্য আধুনিক সেলুন। সেখানে ঝকঝকে চেয়ার, বড় আয়না, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি আর নানা ধরনের সেবা। কিন্তু এসবের বাইরে মল্লিকবাড়ীর বটতলায় কয়েকটি কাঁচি, ক্ষুর ও পুরোনো আয়না নিয়েই দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছেন নরসুন্দররা। তাদের কাছে এই জায়গা শুধু উপার্জনের স্থান নয়, জীবনের দীর্ঘ একটি অধ্যায়ের অংশ।

ত্রিশাল উপজেলার বগারবাজার এলাকার রায়মন চন্দ্র শীলের বয়স প্রায় ৭০ বছর। পাকিস্তান আমল থেকেই নরসুন্দর পেশার সঙ্গে যুক্ত তিনি। দীর্ঘ জীবনে এই পেশার পরিবর্তন নিজের চোখে দেখেছেন।

তিনি বলেন, আমি পাকিস্তান আমল থেকে কাজ করছি। তখন হাতে কাজ থাকত, পকেটেও টাকা থাকত। এখন শুধু হাটের দিনটাতেই কাজ পাই। বাকি সময় গ্রামে গ্রামে ঘুরে কাজ করতে হয়। আগে দিনে সাত-আটশ টাকা আয় হতো, এখন আর তেমন হয় না।

ভালুকার তামাট গ্রামের ইন্দ্রমোহনের বয়স ৭০ পেরিয়েছে। প্রায় ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে মল্লিকবাড়ী বাজারে বসছেন তিনি। তার চোখেও ধরা পড়ে সময়ের পরিবর্তন। একসময় যেখানে খদ্দের সামলাতে ব্যস্ত থাকতে হতো, এখন সেখানে কাজের অপেক্ষায় অনেকটা সময় কেটে যায়।

তবু পুরোনো জায়গাটি ছাড়েননি তিনি। কারণ এই বটগাছ, এই বাজার আর এখানকার মানুষদের সঙ্গে তার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।

তবে ঐতিহ্যের এই ধারায় পুরোপুরি ছেদ পড়েনি। তরুণ প্রজন্মের কেউ কেউ এখনো পুরোনো এই পেশার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত রাখছেন।

উপজেলার পাঁচগাঁও হাজির বাজারের ২৪ বছর বয়সী সুমন শীল নিজের এলাকায় একটি সেলুন পরিচালনা করেন। তারপরও প্রতি শনিবার তিনি চলে আসেন মল্লিকবাড়ী বাজারে। আধুনিক সেলুনে কাজ করার সুযোগ থাকলেও বটতলার এই হাটের প্রতি তার আলাদা টান। সুমন শীল বলেন, এই বাজারের খদ্দেররা পুরোনো। এখানকার পরিবেশের একটা আলাদা টান আছে।

মল্লিকবাড়ী বাজারের সবচেয়ে প্রবীণ নরসুন্দর নুর মোহাম্মদের বয়স ৭৪ বছর। মাত্র ১০ বছর বয়সে এই বাজারে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। এরপর কেটে গেছে ছয় দশকেরও বেশি সময়। বয়স বেড়েছে, বদলেছে বাজারের চেহারা, বদলেছে মানুষের রুচি ও জীবনযাপন। কিন্তু নুর মোহাম্মদের হাতে এখনো কাঁচি ওঠে।

তিনি বলেন, আগে সকাল থেকেই খদ্দেরের সারি লেগে থাকত। এখন আর সেই ভিড় নেই। তবে এখনো প্রতিদিন গড়ে পাঁচশ টাকার মতো আয় হয়।

এই বটতলার নিয়মিত খদ্দেরদের একজন ৯০ বছর বয়সী ফয়েজ উদ্দিন। বহু বছর ধরে এখানেই চুল-দাঁড়ি কাটান তিনি। বয়সের ভারে ধীর হয়ে এলেও পুরোনো জায়গাটির প্রতি তার আস্থা এখনো অটুট।

ফয়েজ উদ্দিন বলেন, সেলুনে গেলে বেশি টাকা লাগে। কিন্তু এখানে কম খরচে ভালো কাজ হয়। তাই এখনো এখানে আসি।

শুধু ফয়েজ উদ্দিন নন, আশপাশের বিভিন্ন এলাকার অনেক মানুষের কাছেই এই বটতলার নরসুন্দররা পরিচিত মুখ। বছরের পর বছর একই জায়গায় বসে কাজ করার কারণে খদ্দেরদের সঙ্গে তাদের তৈরি হয়েছে এক ধরনের পারিবারিক সম্পর্ক। কেউ নিয়মিত আসেন, কেউ আবার দূর গ্রাম থেকে হাটের দিনটি মিলিয়ে চলে আসেন।

মল্লিকবাড়ী বাজারের এই বটতলা তাই কেবল চুল-দাঁড়ি কাটার জায়গা নয়। এটি একইসঙ্গে বহু মানুষের জীবিকার অবলম্বন, পুরোনো পেশার স্মৃতিচিহ্ন এবং গ্রামীণ জীবনের এক জীবন্ত ছবি।

একটি পুরোনো বটগাছের ছায়ায় বসে থাকা কয়েকজন নরসুন্দর যেন সময়ের দুই প্রান্তকে পাশাপাশি ধরে রেখেছেন। একদিকে আধুনিক সেলুনের ঝলমলে জগত, অন্যদিকে কাঁচি-ক্ষুর আর আয়না নিয়ে টিকে থাকা পুরোনো পেশা।

সময়ের সঙ্গে তাদের আয় কমেছে, খদ্দের কমেছে, বদলে গেছে মানুষের অভ্যাসও। তারপরও প্রতি শনিবার বটগাছের নিচে তারা পসরা সাজিয়ে বসেন। অপেক্ষা করেন পরিচিত মুখগুলোর জন্য।

ডিজিটাল যুগ আর আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা এমন দৃশ্য এখন খুব বেশি দেখা যায় না। মল্লিকবাড়ী বাজারের বটতলার এই নরসুন্দরদের হাট তাই শুধু একটি পেশার গল্প নয়, এটি গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতি ও হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল।

প্রতি শনিবার কয়েক ঘণ্টার জন্য জমে ওঠা এই হাটে কাঁচির শব্দের সঙ্গে মিশে থাকে বহু পুরোনো দিনের স্মৃতি। আর সেই স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরেই জীবিকার আশায় এখনো বটগাছের নিচে বসেন নরসুন্দররা।

Facebook Comments Box
১ম লাইন রঙ
২য় লাইন রঙ
ফন্ট সাইজ (65px)

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাতিসংঘে উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান হবে, প্রধানমন্ত্রী হবেন প্রধান বক্তা

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নয়, সমর্থন থাকবে: এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী

গাজায় ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞের গোপন পদ্ধতি ফাঁস নতুন প্রামাণ্যচিত্রে

ভারতের সঙ্গে ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা করছে সরকার, ফলাফল শিগগির: চিফ হুইপ

চার মাসে কুরআনের হাফেজ ৮ বছরের সাজিদ

ফুল দিয়ে সাজানো ঘোড়ারগাড়িতে শিক্ষিকার রাজকীয় বিদায়

পূর্বধলায় গ্রাম পুলিশদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ ও পুরস্কার প্রদান

ময়মনসিংহে যুবকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার

কিশোরগঞ্জে ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের ঘিরে সরগরম সোশ্যাল মিডিয়া

নেত্রকোণা রিফিল ছাড়াই ফায়ার এক্সটিংগুইশারে নকল স্টিকার, কর্মকর্তা বদলি

১০

নেত্রকোণা জেলের জালে উঠে এল শিশুর মরদেহ

১১

নালিতাবাড়ীতে ৮২ জন কৃতী শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা

১২

বাকৃবির তিন ভবনে কর্মকর্তাদের তালা, উপাচার্যের আশ্বাসে অবমুক্ত

১৩

ইলেকট্রিশিয়ানের কাজের কথা বলে রাশিয়ায় নিয়ে পাঠানো হয় যুদ্ধক্ষেত্রে, অতঃপর…

১৪

বায়তুল মোকাররমে শুরু হচ্ছে মাসব্যাপী ইসলামি বইমেলা

১৫

ময়মনসিংহে শিক্ষকের বাসা থেকে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জামাদি জব্দ

১৬

শেরপুরে মাঠ পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার অভিযোগ খামারিদের

১৭

নান্দাইলে দ্রুতগতির বাসের ধাক্কায় নারীর মৃত্যু, ফিঙ্গারপ্রিন্টে পরিচয় শনাক্ত

১৮

শিকড়ের সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মে ছড়িয়ে দিতে ব্রহ্মপুত্রের তীরে ‘ভাব তরঙ্গ’

১৯

জেলের জালে উঠে এল শিশুর মরদেহ

২০
শিরোনামঃ
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাতিসংঘে উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান হবে, প্রধানমন্ত্রী হবেন প্রধান বক্তাস্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নয়, সমর্থন থাকবে: এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রীগাজায় ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞের গোপন পদ্ধতি ফাঁস নতুন প্রামাণ্যচিত্রেভারতের সঙ্গে ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা করছে সরকার, ফলাফল শিগগির: চিফ হুইপচার মাসে কুরআনের হাফেজ ৮ বছরের সাজিদফুল দিয়ে সাজানো ঘোড়ারগাড়িতে শিক্ষিকার রাজকীয় বিদায়পূর্বধলায় গ্রাম পুলিশদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ ও পুরস্কার প্রদানময়মনসিংহে যুবকের গলাকাটা মরদেহ উদ্ধারকিশোরগঞ্জে ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের ঘিরে সরগরম সোশ্যাল মিডিয়ানেত্রকোণা রিফিল ছাড়াই ফায়ার এক্সটিংগুইশারে নকল স্টিকার, কর্মকর্তা বদলি