জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে কৃষিতে এগ্রোইকোলজি বা কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যার চর্চা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। একই সঙ্গে কৃষিতে নারীর অবদানকে স্বীকৃতি, নারী শ্রমিকের মজুরি বৈষম্য দূরীকরণ এবং জাতীয় কৃষিনীতিতে এগ্রোইকোলজি অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সেমিনার কক্ষে ‘খাদ্য ব্যবস্থা, আঞ্চলিক বাস্তবতা ও এগ্রোইকোলজির পথ: ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই ভবিষ্যতের সন্ধ্যানে’ শীর্ষক এক আঞ্চলিক সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন।
উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিকের আয়োজনে এবং রোজা লুক্সেমবার্গ স্টিফটুং সাউথ এশিয়ার সহযোগিতায় এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এতে ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং বারসিকের কর্মকর্তারা অংশ নেন।
সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মাসুম আহমাদ। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমান এবং অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুজ্জামান। সংলাপে সভাপতিত্ব করেন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. নেছার উদ্দিন। সঞ্চালনা করেন একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সবিবুল হক।
শুরুতে বারসিকের নেত্রকোনা অঞ্চলের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. অহিদুর রহমান শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন। পরে বারসিকের বরেন্দ্র অঞ্চলের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শহীদুল ইসলাম পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনার মাধ্যমে সংলাপের মূল বিষয়বস্তু তুলে ধরেন। এরপর শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অংশগ্রহণকারীরা উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন।
আলোচনায় অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, ধান, সবজি ও মসলাসহ বিভিন্ন ফসলের স্থানীয় জাত সংরক্ষণে বারসিকের উদ্যোগ আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। স্থানীয় মানুষের লোকায়ত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে এলাকাভিত্তিক বীজ ও ফসলের বৈচিত্র্য সংরক্ষণ করতে হবে।
শিক্ষার্থী সাদিয়া ইসলাম বলেন, নারীরা পরিবার ও কৃষিতে প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ শ্রম দিলেও তাঁদের কাজের যথাযথ স্বীকৃতি ও আর্থিক মূল্যায়ন হয় না। পানি সংগ্রহ, কৃষিকাজ, বীজ সংরক্ষণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অবদানকে কৃষিশ্রম হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। পাশাপাশি নারী শ্রমিকের মজুরি বৈষম্য দূর করতে হবে।
অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যাপক প্রয়োগের ফলে নানা ধরনের সংকট তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে রাসায়নিক কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার খাদ্য ও পরিবেশের ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এগ্রোইকোলজির বিকল্প নেই। এর মাধ্যমে টেকসই কৃষি, নিরাপদ খাদ্য এবং খাদ্য সার্বভৌমত্ব অর্জনের পথ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বন্য উদ্ভিদ ও স্থানীয় প্রজাতির বৈচিত্র্য রক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মাসুম আহমাদ বলেন, আমরা খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছি, কিন্তু নিরাপদ ও টেকসই কৃষির বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করছি না। কৃষিতে নারীর অবদান থাকলেও তাঁদের কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে আমরা অনেক ক্ষেত্রে আগ্রহী নই। এ অবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, মানুষের জন্য এমন খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করবে না। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য উৎপাদনে কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান জাতীয় নীতিমালায় কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যাকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. নেছার উদ্দিন বারসিকের উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, হাওর, পাহাড় ও সমতল অঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও খাদ্যব্যবস্থার সংকট এবং বাস্তবতা চিহ্নিত করা জরুরি। আজকের সংলাপের মাধ্যমে এসব বিষয় চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে কৃষি, পরিবেশ, নারী ও কৃষকের অধিকারকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে এগ্রোইকোলজির চর্চা ও নীতিগত স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয় ও লোকায়ত জ্ঞানের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে নিরাপদ ও টেকসই খাদ্য উৎপাদনের উদ্যোগ এগিয়ে নিতে হবে।
সংলাপে ময়মনসিংহ অঞ্চলের হাওর, পাহাড় ও সমতল এলাকার কৃষিপ্রতিবেশ, স্থানীয় বীজ সংরক্ষণ, খাদ্যনিরাপত্তা, নারীর অধিকার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা উঠে আসে।
মন্তব্য করুন