বাকৃবি প্রতিনিধি:বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) কম্বাইন্ড ডিগ্রি চালুর দাবিতে ২০২৫ সালের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের একাংশের সাম্প্রতিক ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া এক শিক্ষার্থী একই কোর্সের তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক দুই অংশেই অকৃতকার্য হওয়ার পর মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নিরপেক্ষ পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন তাঁর সহপাঠীদের কেউ কেউ। তবে ফলাফলে আন্দোলনের কোনো প্রভাব পড়েছে কি না, তা এখনো প্রমাণিত নয়।

ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছেন পশুপালন অনুষদের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এএনএম এহসানুল হক হিমেল। গত ১৮ আগস্ট প্রকাশিত লেভেল-৩, সেমিস্টার-২-এর ফলাফলে অ্যানিমেল সায়েন্স বিভাগের ‘মিট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ কোর্সের তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক উভয় অংশে তিনি অকৃতকার্য হয়েছেন।

হিমেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর আগের সেমিস্টারগুলোর নম্বরপত্র প্রকাশ করেছেন। সেখানে দেখা যায়, লেভেল-২, সেমিস্টার-২ পর্যন্ত তাঁর সিজিপিএ ছিল ৩.৬৭১ এবং কোনো বিষয়ে অকৃতকার্যতার তথ্য ছিল না। আন্দোলন-পরবর্তী প্রথম সেমিস্টারে তাঁর সিজিপিএ ২.৯৪৬-এ নেমে আসে। পরবর্তী সেমিস্টারে তা বেড়ে ৩.২৭৮ হলেও একটি কোর্সের তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক দুই অংশেই এফ গ্রেড আসে।

হিমেলের দাবি, নিয়মিত ক্লাস টেস্ট, উপস্থিতি ও নোটবুকে তাঁর পারফরম্যান্স বিবেচনায় এমন ফলাফল তাঁর কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। তাঁর নম্বরপত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। কয়েকজন শিক্ষার্থী ফলাফল নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনার দাবি জানান।

তবে শুধু হিমেলের ফলাফল নয়, ভেটেরিনারি অনুষদের বিভিন্ন ব্যাচের কয়েকটি কোর্সের ফলাফল নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে জানা গেছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, দ্বিতীয় বর্ষের ‘এলিমেন্টারি ডেইরি সায়েন্স’ এবং তৃতীয় বর্ষের ‘অ্যানিমেল ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট’ কোর্সে একই সেমিস্টারের অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় ফলাফল তুলনামূলক কম হয়েছে।

ডিন কার্যালয়ের তথ্যমতে, ওই দুই কোর্সেই সর্বোচ্চ গ্রেড পেয়েছেন তিনজন করে শিক্ষার্থী। লেভেল-১-এর শিক্ষার্থীদের মধ্যেও পশুপালন অনুষদের কয়েকটি কোর্সের ফলাফল নিয়ে অসন্তোষের কথা জানা গেছে। তবে এসব ফলাফল মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয় এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা সিদ্ধান্ত এখনো পাওয়া যায়নি।

গত ২৬ জানুয়ারি ভেটেরিনারি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমানের মাধ্যমে লেভেল-২ ও লেভেল-৩-এর শিক্ষার্থীরা ফলাফল পুনরালোচনার দাবিতে উপাচার্য বরাবর পৃথক আবেদন করেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ছয় মাসের বেশি সময় পার হলেও ওই আবেদনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভেটেরিনারি অনুষদের এক শিক্ষার্থী গণমাধ্যমকে বলেন, কম্বাইন্ড ডিগ্রি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দুই অনুষদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল, তার কোনো প্রভাব একাডেমিক মূল্যায়নে পড়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

পশুপালন অনুষদের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শিবলী সাদী গণমাধ্যমকে বলেন, আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীর সাম্প্রতিক ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ‘মিট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ কোর্সে কারও তত্ত্বীয়, কারও ব্যবহারিক এবং কারও উভয় অংশে অকৃতকার্যতার বিষয়টি সামনে এসেছে। গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বরের সমঝোতা সভায় উপাচার্য আন্দোলনকারীদের কোনো একাডেমিক শাস্তি না দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাই পরবর্তী ফলাফলে এর কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানান তিনি।

এদিকে বাকৃবির বর্তমান ও সাবেক ২৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী নিয়ে গঠিত ফেসবুক গ্রুপ ‘বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (অল টুগেদার ১৯৬১-ইনফিনিটি)’-তে বিষয়টি নিয়ে অনেকে মতামত দিয়েছেন। মো. নূর আলম বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

সাবেক শিক্ষার্থী মো. আশরাফুল আলম তাঁর ফেসবুক পোস্টে হিমেলের প্রতি অন্যায় হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে যাচাইয়ের আহ্বান জানান। তিনি প্রয়োজনে পরীক্ষার উত্তরপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা জানার দাবি তোলেন।

অন্যদিকে মো. আব্দুল ওয়াহাব তাঁর ফেসবুক পোস্টে জানান, অতীতে কম্বাইন্ড ডিগ্রি আন্দোলনের বিষয়ে তিনি হিমেলের বিপরীত অবস্থানে ছিলেন। তবে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত মতপার্থক্য বা অতীতের কোনো ঘটনার প্রভাব থাকা উচিত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। অভিযোগগুলো সত্য হলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখার প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

পশুপালন অনুষদের ডিন ড. মো. রকিবুল ইসলাম খান গণমাধ্যমকে বলেন, পেশাগত দায়িত্ব সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখা জরুরি। ব্যক্তিগত বিরোধ বা কোনো আন্দোলনের প্রভাব পরীক্ষার ফলাফলে পড়া উচিত নয়। শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা সত্যি বলে তিনি মনে করেন না। তবে এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে তা দুঃখজনক হবে। নিশ্চিত তথ্য ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ না করে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন করার পরামর্শ দেন তিনি এবং ডিন হিসেবে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

ভেটেরিনারি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, শিক্ষার্থীদের আবেদন তিনি সংগ্রহ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো জবাব পাননি।

ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল হক গণমাধ্যমকে জানান, আবেদনের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া গণমাধ্যমকে বলেন, অভিযোগকারীকে বিস্তারিত বিবরণসহ নতুন করে আবেদন করতে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির মাধ্যমে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান বিধিবিধান অনুসরণ করে ফলাফল পুনর্মূল্যায়নের প্রক্রিয়া নেওয়া হবে।

ফলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য সবকিছু বিবেচনায় বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।