কিশোরগঞ্জ সংবাদদাতা : কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিবেশীদের হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে বিরোধপূর্ণ জমি দখলের উদ্দেশ্যে সহযোগীদের নিয়ে নিজের মাকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে মেয়ের বিরুদ্ধে। ঘটনার প্রায় সাড়ে তিন বছর পর চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় নিহতের মেয়ে চম্পা (৪৮) আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) কিশোরগঞ্জ পিবিআই কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানানো হয়।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ রাতে করিমগঞ্জ উপজেলার সিন্দ্বীপ গ্রামের নিজ বসতঘরে ঘুমিয়ে পড়েন মোছা. হালিমা (৬৫)। পরদিন সকালে ঘুম থেকে না ওঠায় তাঁর মেয়ে চম্পা ঘরের সামনে গিয়ে দেখতে পান, দরজায় বাইরে থেকে শিকল লাগানো। পরে শিকল ভেঙে ঘরে প্রবেশ করেন তিনি।
এরপর বাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরের একটি পতিত জমিতে হালিমার মরদেহ পড়ে থাকার খবর পাওয়া যায়। সেখানে গিয়ে মরদেহের মাথার অংশ মাটিতে পুঁতে রাখা, নাক ও মুখে আঘাতের চিহ্ন এবং গলায় সাদা রশি পেঁচানো অবস্থায় দেখা যায় বলে পুলিশ জানায়।
এ ঘটনায় চম্পা বাদী হয়ে ২০২৩ সালের ১৪ মার্চ করিমগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করা হয়।
পরবর্তী সময়ে মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হলে সংস্থাটি তদন্ত শুরু করে। তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণের একপর্যায়ে মামলার বাদী চম্পার ভূমিকা নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন বলে পিবিআই দাবি করেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে পিবিআই জানায়, প্রায় ৩০ বছর আগে প্রতিবেশী বিল্লালের কাছ থেকে সাড়ে তিন শতাংশ বাড়ির জায়গা কেনার দাবি করেছিলেন হালিমা। তবে ওই জমির কোনো দলিল হয়নি। পরবর্তী সময়ে বিল্লাল জমিটি অন্য একজনের কাছে বিক্রি করলে জায়গাটি নিয়ে হালিমার সঙ্গে তাঁর বিরোধ সৃষ্টি হয়। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে একাধিকবার ঝগড়া ও মারামারির ঘটনাও ঘটে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১৫ দিন আগে পূর্বশত্রুতার জেরে বিল্লাল হালিমাকে মারধর করেন। পরে তাঁকে করিমগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়ার পাশাপাশি বিল্লালসহ প্রতিবেশীদের হত্যা মামলায় জড়িয়ে বিরোধপূর্ণ জমি নিজেদের দখলে নেওয়ার উদ্দেশ্যে চম্পা সহযোগীদের নিয়ে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশের দাবি, পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ রাত ১১টার দিকে চম্পার সহযোগীরা তাঁদের বাড়িতে আসে। চম্পা আগের বিরোধ মীমাংসার কথা বলে তাঁর মাকে ঘর থেকে ডেকে বের করেন। পরে সহযোগীরা হালিমাকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে এবং মরদেহের মাথার অংশ মাটিতে পুঁতে রাখে বলে পিবিআই জানিয়েছে।
এরপর পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী চম্পা প্রতিবেশী বিল্লালসহ অন্যদের আসামি করে করিমগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পিবিআইয়ের দাবি, হত্যাকাণ্ডের দায় প্রতিবেশীদের ওপর চাপিয়ে তাঁদের আইনি জটিলতায় ফেলা এবং বিরোধপূর্ণ জমি দখলের পথ তৈরি করাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
পিবিআই জানায়, তদন্তের একপর্যায়ে চম্পা নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। পরে গত ১৮ আগস্ট ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে তাঁর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
পিবিআই কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ আল মাসুদ গণমাধ্যমকে বলেন, জমি নিয়ে পূর্বশত্রুতার জেরে প্রতিপক্ষকে হত্যা মামলায় ফাঁসিয়ে বিরোধপূর্ণ জমি দখলের উদ্দেশ্যে নিজের মাকে সহযোগীদের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে বলে তদন্তে পাওয়া গেছে।
তিনি আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আদালতে যথাযথ প্রমাণ উপস্থাপনের লক্ষ্যে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ঘটনায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন