চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় ময়মনসিংহ মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীন ১৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১০২ জন শিক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হয়েছেন। জেলার হিসাবে সবচেয়ে বেশি শতভাগ অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠান ময়মনসিংহে। এ ছাড়া নেত্রকোনা, জামালপুর ও শেরপুর জেলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ফলাফলও হতাশাজনক।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম, পাঠদানের পরিবেশ, শিক্ষক উপস্থিতি ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইতিমধ্যে ১৯টি প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে শিক্ষা বোর্ড। তাঁদের জবাব সন্তোষজনক না হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বেতন-ভাতাসহ এমপিও বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে বোর্ড কর্তৃপক্ষ।
বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৩১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মোট ৭৩ হাজার ৪২০ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৩৬ হাজার ৩৫৪ জন। সে হিসাবে বোর্ডের সামগ্রিক পাসের হার ৫১ দশমিক ৪৪ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২ হাজার ১৩৭ জন শিক্ষার্থী। মানচিত্রদেখুন
তবে বোর্ডের সামগ্রিক ফলাফলের চিত্রের বাইরে ১৯টি প্রতিষ্ঠানের ফলাফল একেবারেই হতাশাজনক। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে অংশ নেওয়া একজন পরীক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হতে পারেননি। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানগুলোতে পরীক্ষার্থীদের পাসের হার শূন্য শতাংশ।
জেলাভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, শতভাগ অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ময়মনসিংহ জেলায়। এ জেলার সাতটি প্রতিষ্ঠানের ৪৩ জন পরীক্ষার্থীর কেউ পাস করতে পারেননি। নেত্রকোনার ছয়টি প্রতিষ্ঠানের ৩৩ জন, জামালপুরের চারটি প্রতিষ্ঠানের ১৮ জন এবং শেরপুরের দুটি প্রতিষ্ঠানের আটজন পরীক্ষার্থী সবাই অকৃতকার্য হয়েছেন।
চার জেলার মোট ১৯টি প্রতিষ্ঠানের ১০২ জন পরীক্ষার্থীর কেউ উত্তীর্ণ হতে না পারার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম ও ফলাফল ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
শতভাগ অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী ছিল ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার এইচ. এ. ডিজিটাল কলেজে। প্রতিষ্ঠানটি থেকে ২৬ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলেও তাঁদের কেউ উত্তীর্ণ হতে পারেননি। একইভাবে নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার এমবিশন মডেল কলেজের ১৬ জন পরীক্ষার্থীর ফলাফলও শূন্য।
ময়মনসিংহ জেলার বাকি পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঈশ্বরগঞ্জের কোনাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজে ছয়জন এবং চরজিথর উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজে একজন পরীক্ষার্থী ছিলেন। হালুয়াঘাটের বাঘাইতলা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে পাঁচজন, ত্রিশালের আউলিয়া নগর কলেজে পাঁচজন, নান্দাইলের অ্যাডভোকেট আব্দুল হাই কলেজে দুজন এবং বেরীলা কে. এ. হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজে একজন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে সবাই অকৃতকার্য হয়েছেন। মানচিত্রদেখুন
শতভাগ অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তারাকান্দার এইচ. এ. ডিজিটাল কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে বিশেষভাবে প্রশ্ন উঠেছে। সরেজমিনে প্রতিষ্ঠানটির নির্ধারিত ঠিকানায় গিয়ে কোনো শিক্ষা কার্যক্রমের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, একসময় ভাড়া করা জায়গায় কলেজটির কার্যক্রম পরিচালিত হতো। তবে বর্তমানে সেখানে পাঠদান হয় না।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ২৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেওয়ার পরও সবাই অকৃতকার্য হওয়া এবং নির্ধারিত ঠিকানায় গিয়ে শিক্ষা কার্যক্রমের অস্তিত্ব না পাওয়ার বিষয়টি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা ও পাঠদান পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার চরজিথর উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. সেলিমের বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানটির কলেজ শাখার শিক্ষকসংকট ও পাঠদান পরিস্থিতির একটি চিত্র উঠে এসেছে।
তিনি জানান, কাগজে-কলমে কলেজটিতে ১০ জন শিক্ষক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন অন্যত্র চলে গেছেন। বর্তমানে সাতজন শিক্ষক থাকলেও কেউ কলেজে আসেন না। কলেজ শাখাটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় তাঁরা বেতন পান না। প্রায় ১০ বছর বিনা পারিশ্রমিকে পাঠদান করার পর শিক্ষকেরা কার্যক্রম থেকে সরে গেছেন।
অধ্যক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষকদের বারবার নোটিশ দিয়েও তাঁদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। এবার প্রতিষ্ঠানটির একমাত্র পরীক্ষার্থীও অকৃতকার্য হয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে কলেজ শাখার নিবন্ধন বাতিলের আবেদন করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, ঈশ্বরগঞ্জের কোনাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. আব্দুল লতিফ জানিয়েছেন, এ বছর প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠানটির কলেজ শাখা থেকে শিক্ষার্থীরা এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। ছয়জন পরীক্ষার্থীর কেউ পাস করতে পারেননি।
তিনি বলেন, কলেজ শাখায় তিনজন শিক্ষক রয়েছেন। পাশাপাশি স্কুল শাখার আরও দুজন শিক্ষক অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে কলেজের ক্লাস নিয়েছেন। শুরুতে কিছুটা সমস্যা থাকলেও আগামীতে ভালো ফলের আশা করছেন তাঁরা।
নেত্রকোনা জেলার ছয়টি প্রতিষ্ঠানের ৩৩ জন পরীক্ষার্থীই অকৃতকার্য হয়েছেন। এর মধ্যে জুবাইদা জহুর উদ্দিন সরকার মহিলা কলেজে ছয়জন, খালিশাপুর উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ভাষাসৈনিক আবুল হোসেন কলেজে চারজন করে, কলমাকান্দা মহিলা কলেজে দুজন এবং কেন্দুয়ার গোপালপুর মডেল কলেজে একজন পরীক্ষার্থী ছিলেন। এ ছাড়া পূর্বধলার এমবিশন মডেল কলেজের ১৬ জন পরীক্ষার্থীর কেউ পাস করতে পারেননি।
জামালপুর জেলার চারটি প্রতিষ্ঠানের ১৮ জন পরীক্ষার্থীর ফলাফলও শূন্য। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো গোয়ালচর উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ, শ্রীপুর কুমারিয়া নাসুবা আকন্দ গার্লস স্কুল, নলবেছা উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ এবং এস. এম. শিক্ষা মুখলেছুর রহমান কলেজ। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যথাক্রমে সাতজন, ছয়জন, চারজন ও একজন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন।
শেরপুর জেলার দুটি প্রতিষ্ঠানের আটজন পরীক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হতে পারেননি। এর মধ্যে মনমথ দে কলেজ থেকে সাতজন এবং আলহাজ এস. এম. এ. ওয়ারেজ নঈম মডেল কলেজ থেকে একজন পরীক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন।
ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আ. জ. ম. রেজাউল করিম খান গনমাধ্যমকে বলেন, শতভাগ অকৃতকার্য ১৯টি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। মানচিত্রদেখুন
তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের জবাব সন্তোষজনক না হলে প্রয়োজনে শিক্ষকদের বেতন-ভাতাসহ এমপিও বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন