প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আগামী বছর জাতীয় গ্রিডে ৩-৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে।
আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকালে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা জানান।
বাংলাদেশ সোলার এক্সপো-২০২৬-এর এবারের মূল প্রতিপাদ্য ‘প্রতি ইঞ্চি ছাদ কাজে লাগাই, সৌরবিদ্যুতে আয় বাড়াই’।
তারেক রহমান বলেন, শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, খরচও কমাতে চায় সরকার। নিজস্ব উৎস্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে দেশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তিনি বলেন, আজকের এই্ প্রতিযোগিতায় কমপক্ষে ৩ শতাধিক মেধাবী তরুণ তরুণী নতুন আইডিয়া উপস্থাপন করেছিলেন। আমি প্রত্যেককেই আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানাই। আমি চাই, আগামীর বাংলাদেশে এভাবে জ্ঞানের প্রতিযোগিতা চলুক। চলুক…নিত্য নতুন উদ্ভাবনী আইডিয়ার প্রতিযোগিতা। আমাদের মনে রক্ষা জরুরি, আপনার একটি ইনোভেটিভ আইডিয়াই হয়তো বাংলাদেশের জন্য হতে পারে গেইম চেঞ্জিং। অর্থের অভাবে যাতে তারুণ্যের কোনো উদ্ভাবনী আইডিয়া হারিয়ে না যায় সেটি নিশ্চিত করতে বর্তমান চলতি বাজেটে ‘স্টার্ট আপ’ এর জন্য বছরে ৫০০ কোটি বরাদ্দ করেছে।
তিনি আরও বলেন, আপনারা জানেন, দেশটাকে সম্পূর্ণ আমদানি নির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করে ফেলা হয়েছিল। ফলে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমদানি প্রক্রিয়ায় মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার কারণে জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশেকে সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে। দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার বিদ্যুৎ খাতে ৪৩ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে।
প্রধান মন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছরেও বিদ্যুতের প্রায় সমপরিমাণ চাহিদা রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার ডিজেলের মজুদ বাড়িয়েছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য কয়লার সরবরাহ ও মজুদ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিকল্প সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। জ্বালানি তেল সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ইতোমধ্যেই ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিগত সরকারগুলোর ব্যর্থতা কিংবা ভূমিকা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করে সময়ক্ষেপণের পরিবর্তে আগামী দিনগুলোতে কিভাবে বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো যায়, বাসা বাড়ি এবং ব্যবসা বাণিজ্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়, বর্তমান সরকারের কাছে সেটিই প্রধান অগ্রাধিকার।
তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতিতে জনগণের ভোগান্তি সম্পর্কে সরকার সচেতন। ফলে চলমান জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় ও চুক্তি পর্যালোচনা করা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ এসব বিষয়গুলো নিয়ে সরকার একযোগে কাজ করছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে সরকার সরকার ইতোমধ্যেই ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুত চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি মানুষের সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। আমি যদি আরো স্পষ্ট করে বলি, আপনাদের মতো উদ্যোক্তারাই এই উদ্যোগের মূল চালিকাশক্তি। সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে অর্থায়ন সহজ করতে সরকার প্রাথমিকভাবে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দ করেছে। পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করা হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা যেন শুধু অর্থের অভাবে পিছিয়ে না পড়েন সরকার সেটি নিশ্চিত করতে চায়।
প্রধানম মন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আপনারা জেনে আস্বস্ত হবেন যে, সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সম্প্রসারণ সহজ করতে সরকার ইতোমধ্যেই ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। এ খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিভিন্ন নীতি সহায়তা, কর ও শুল্ক সুবিধা এবং আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা নিয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনামাফিক এগুলে গ্রীষ্ম মৌসুম শুরুর আগেই সরকার জাতীয় গ্রীডে ৩ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎযুক্ত করতে সক্ষম হবে ইনশাআল্লাহ।
প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সরকারের প্রত্যাশা, সরকারি-বেসরকারি অফিস, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং বাসাবাড়ির অব্যবহৃত ছাদগুলো সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত হবে। সৌরবিদ্যুৎ সিস্টেম থেকে নিজস্ব ব্যবহারের পর যারা বাড়তি সৌর বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে সক্ষম হবেন ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে প্রণোদনাসহ সরকার প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে ক্রয় করবে।
আপনারা জানেন, ইতোমধ্যেই অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কাজ এগিয়ে চলছে। আপনাদের কেউ কেউ হয়তো জেনে থাকতে পারেন,
সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আপনাদের প্রতি আহবান জানানোর আগে আমি নিজেও কিন্তু আমার বাসায় ‘সোলার প্যানেল’ স্থাপন করেছি। ইতোমধ্যেই আমার বাসায় ব্যবহারের পর বিদ্যুতের কিছু অতিরিক্ত ইউনিট জাতীয় গ্রীডে যুক্ত করতেও সক্ষম হয়েছি।
আমি মনে করি, সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নের পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ যন্ত্রপাতির দাম কমানো হচ্ছে। সৌর প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির মতো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির আমদানি এবং দেশীয় উৎপাদন উৎসাহিত করতে কর ও শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে। শুধু বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনই একমাত্র লক্ষ্য নয়, জনগণের ব্যবহারের জন্য বিদ্যুতের খরচ কমানোও সরকারের অগ্রাধিকার।
সৌরবিদ্যুৎ খাতে সম্পৃক্ত ৮ হাজারের বেশি নতুন ‘সার্ভিস প্রোভাইডার’ প্রতিষ্ঠান যারা আজকের এই আয়োজনের সঙ্গে রয়েছেন, তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, একটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করার পর সেটি ঠিকমতো কাজ করছে কি না, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে কি না এবং গ্রাহক প্রয়োজনীয় সেবা পাচ্ছেন কি না, অনুগ্রহপূর্বক সেদিকে লক্ষ্য রাখবেন। অপরদিকে আমি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহবান দোয়া করে আপনারা উদ্যোক্তাদের সঙ্গে
নিয়মিত যোগাযোগ রাখুন।তাঁদের সমস্যা সম্ভাবনার প্রতি আন্তরিক থাকুন।
প্রধান মন্ত্রী বলেন, কৃষিতেও সৌরবিদ্যুত ব্যবহারের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষকদের সেচের জন্য সরকার ভর্তুকি মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। সরকার পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পকে সৌরচালিত সেচ পাম্পে রূপান্তর করার পদক্ষেপ নিয়েছে। এর ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমবে, পরিবেশ সংরক্ষিত হবে এবং জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎও সাশ্রয় হবে। একইভাবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে হিমাগার, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ এবং গ্রামীণ ক্ষুদ্র উদ্যোগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা সম্ভব।
আমি মনে করি, জনগণের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন সরকারের দায়, অপরদিকে বিদ্যুতের সঠিক ও সাশ্রয়ী ব্যবহার জনগণের দায়িত্ব। সুতরাং, সবার প্রতি অনুরোধ, দিনের বেলায় যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক আলো-বাতাস উপভোগের পাশাপাশি বাসা অফিসে বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অপ্রয়োজনে ভাল্ব, ফ্যান অথবা নানারকমের ইলেকট্রনিক গ্যাজেট বন্ধ রাখাও নাগরিকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বলেও আমি মনে করি।
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী যারা দীর্ঘদিন ধরে এই খাতের বিকাশে সক্রিয় রয়েছেন, তাদের প্রতি আহবান শুধু বড় প্রকল্পে নয়, স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দ্বারা সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগেও অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়টি নিয়েও আপনাদের সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে বলেও আমার বিশ্বাস।
সৌরবিদ্যুৎ খাতে প্রবাসী বাংলাদেশিদেরও বিনিয়োগের সহজ সুযোগ রয়েছে। আমি চাই, আজকের এই সোলার এক্সপো কেবল দুই দিনের একটি প্রদর্শনী হয়ে যেন শেষ না হয়। এখান থেকে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হোক।
নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হোক। ব্যাংক ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে সংযোগ তৈরি হোক। তরুণেরা প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাক। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের বাস্তব উদ্যোগ গড়ে উঠুক।
আমি বিশ্বাস করি, সরকার, উদ্যোক্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী এবং সাধারণ মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা অর্জন অসম্ভব হবে না ইনশাল্লাহ।
আসুন, আমরা সূর্যের আলোকে দেশের সম্পদে পরিণত করি। বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
এই প্রত্যাশায় ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো ২০২৬’-এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করছি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মিরানা মাহরুখ উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতি মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মন্তব্য করুন