প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে স্থাপন করা হয়েছিল কমিউনিটি ক্লিনিক। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতায় উল্টো চিকিৎসাসেবার (সংস্কারের) জন্য যেন আকুতি জানাচ্ছে জীর্ণ ভবনগুলো। ভবনের ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা, ছাদ ফুটো হয়ে ভেতরে ঝরছে বৃষ্টির পানি।
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মনিটরিং না থাকায় স্বাস্থ্যকর্মীরা অফিস করেন না নিয়মিত। প্রায় মাসজুড়েই থাকে ওষুধের সংকট। এমন চিত্র ত্রিশালের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর। এতে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রোগীরা। ঝুঁকি নিয়ে জীর্ণ ভবনে চলছে কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম।
ত্রিশাল উপজেলার জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে ১২টি ইউনিয়নে রয়েছে ৪৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক। ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে এসব কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ ও কার্যক্রম শুরু হয়। নির্মাণের পর থেকে সংস্কারকাজ না হওয়ায় বেশির ভাগ ভবন ইতোমধ্যে ব্যবহারে অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ঝুঁকি নিয়েই সেবা দিয়ে যাচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।
উপজেলার ৪৮টি কমিউনিটি ক্লিনিকের বেশির ভাগই বেহাল। অনেক ভবনের ছাদ ও দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ছে। কোথাও কোথাও নেই বিদ্যুৎ সরবরাহ ও পানির ব্যবস্থা। শৌচাগার থাকলেও তা নষ্ট হয়ে ব্যবহার অনুপযোগী। অধিকাংশ ভবনের দরজা-জানালা খুলে গেছে। ছাদেও ধরেছে ফাটল। প্রয়োজনীয় আসবাপত্র না থাকায় ওষুধগুলোও অযত্নে পড়ে থাকে। রোগীরা ঝুঁকি নিয়েই এসব ক্লিনিকে সেবা নিচ্ছেন, ঝুঁকিতে স্বাস্থ্যকর্মীরাও। অনেক ক্লিনিকে নেই প্রয়োজনীয় জনবল। কিছু ক্লিনিকে ওষুধের সংকট রয়েছে। আবার অনেক ক্লিনিকে ফ্যান থাকলেও টানানোর অবস্থা নেই। নেই রোগীদের বসার ব্যবস্থা। কিছু ভবন একেবারেই ব্যবহার উপযোগী নয়। জীর্ণ ভবনগুলোর দিকে চোখ তুলে তাকালে, যে কারও হয়তো মনে হবে এগুলো মোঘল আমলে নির্মিত।
সরেজমিন দেখা গেছে, কানিহারী ইউনিয়নের কুষ্টিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের ভবনের ছাদ ও দেয়াল থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা। ছাদ ফুটো হয়ে গেছে। নেই শৌচাগার, বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা।
বালিদিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকের দরজা-জানালা খুলে গেছে, ছাদে ফাটল ধরেছে, দেয়াল থেকে খসে পড়েছে পলেস্তারা। রোগীর বসার ব্যবস্থা নেই। প্রয়োজনীয় আসবাপত্র না থাকায় ওষুধগুলোও অযত্নে পড়ে আছে। ফ্যান থাকলেও টানানোর অবস্থা নেই।
সেবা নিতে আসা স্থানীয় রাজিয়া সুলতানা, তাসলিমা আক্তার ও জুয়েল মিয়া জানান, গ্রামের মানুষ কিছুটা সেবা পেলেও বছরের পর বছর অযত্ন-অবহেলায় কোনো রকমে চলছে এসব ক্লিনিক। সংস্কারের অভাবে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোই যেন রোগী হয়ে পড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এসব ক্লিনিকে যে কোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। তারা বলেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স অনেকটা দূরে হওয়ায় ঝুঁকি নিয়ে এখানে সেবা নিতে এলেও প্রায় সময় মেলে না ওষুধ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক স্বাস্থ্যকর্মী বলেন, প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবু সেবা দিতে হচ্ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জিয়াউল বারীর ভাষ্য, ৪৮টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে ৩০-৩২টি ঝুঁকিপূর্ণ। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো ভেঙে নতুন করে নির্মাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদা পাঠানো হয়েছে। সংস্কারের জন্য কোনো বরাদ্দ আসে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে আসে না। সরকারিভাবে স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগে এলে তারাই নির্বাচন করে কাজগুলো করে থাকে। এ সংক্রান্ত বিষয়ে চার-পাঁচবার প্রতিবেদন পাঠিয়েছি।’ তিনি জানান, প্রতিটি ক্লিনিক মাসে একবার ট্রাস্ট থেকে আসা মাত্র এক কার্টন ওষুধ পায়। সেটা শেষ হয়ে গেলে সংকট তো থেকেই যাবে। আর সেখানে যারা দায়িত্বে থাকেন তারা শুধু প্রাথমিক চিকিৎসা ও পরামর্শ দেবেন।
মন্তব্য করুন