শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে কাঠ ব্যবসার কথা বলে ডেকে নিয়ে আটকে রেখে মারধর, প্রাণনাশের হুমকি এবং মোটরসাইকেল, আইফোন, স্মার্টওয়াচ ও নগদ টাকা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে মিজানুর রহমান মিজানসহ অজ্ঞাতনামা পাঁচ-ছয়জনের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী জান্নাতুল নাঈম। তাঁর দাবি, আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দিয়েছেন।
বুধবার বিকেলে ঝিনাইগাতী সদর বাজারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব অভিযোগ করেন জান্নাতুল নাঈম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। তিনি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার পাড়া পাচাশী গ্রামের নুরুল হকের ছেলে।
লিখিত বক্তব্যে জান্নাতুল নাঈম দাবি করেন, গত ২২ সেপ্টেম্বর কাঠ বিক্রির কথা বলে তাঁকে নালিতাবাড়ী আড়াইআনি বাজারের কালেমা চত্বরে ডেকে নেন মিজানুর রহমান মিজান। পরে তাঁকে স্থানীয় একটি কফি হাউসে নেওয়া হয়। সেখান থেকে কাঠ দেখানোর কথা বলে কেরেঙ্গাপাড়া গ্রামের রাজমিস্ত্রি সাত্তারের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
অভিযোগকারীর ভাষ্য, ওই বাড়ির একটি কক্ষে তাঁকে আটকে রেখে মারধর করা হয়। এ সময় তাঁর মোবাইল ফোন ও মোটরসাইকেলের চাবি নিয়ে নেওয়া হয়। মারধরে তাঁর কানের পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পায়ে গুরুতর আঘাত লাগে বলেও দাবি করেন তিনি।
জান্নাতুল নাঈম আরও অভিযোগ করেন, তাঁকে চাপ প্রয়োগ করে মোবাইল ফোনের পাসওয়ার্ড দিতে বাধ্য করা হয়। এরপর ফোনে থাকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট, ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়। এ ছাড়া তাঁর ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের নেক্সাসপে অ্যাপের পাসওয়ার্ডও চাওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।
তাঁর অভিযোগ, মানিব্যাগে থাকা এটিএম ডেবিট কার্ড, মায়ের ছবি, মোটরসাইকেলের স্মার্টকার্ড ও নগদ পাঁচ হাজার টাকা এবং ব্যাগে থাকা আরও দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা নিয়ে নেওয়া হয়। পরে এটিএম কার্ড ব্যবহার করে টাকা তোলার চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।
অভিযোগকারী আরও দাবি করেন, তাঁকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয় এবং টাকা না দিলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এ ছাড়া জাপানপ্রবাসী ‘অহমবষ গড়ড়হ’ নামের একটি ফেসবুক আইডির ব্যবহারকারী লিমা সাহার কাছ থেকে ১৫ থেকে ১৮ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ তুলে তাঁকে আটকে রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলার সুযোগ তাঁকে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন জান্নাতুল নাঈম।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেল আনুমানিক ৫টা ৪০ মিনিট থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত তাঁকে আটকে রাখা হয়। পরে রিপন নামের এক ব্যক্তি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প নিয়ে আসেন। ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর না করলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি। প্রাণভয়ে আট থেকে নয়টি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন বলেও জানান অভিযোগকারী।
জান্নাতুল নাঈমের দাবি, শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ওষুধ খাওয়ানো হয়। পরে অন্য একটি মোটরসাইকেলে করে হালুয়াঘাট বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে তাঁকে রেখে যাওয়া হয়। সেখান থেকে এক চায়ের দোকানির ফোন ব্যবহার করে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। পরে রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে ঈশ্বরগঞ্জে নিজ বাড়িতে ফিরে চিকিৎসা নেন বলে জানান।
এ ঘটনায় মিজানুর রহমান মিজানসহ অজ্ঞাতনামা পাঁচ-ছয়জনের বিরুদ্ধে শেরপুরের আদালতে সিআর মামলা নম্বর ৮০৬/২০২৬ দায়ের করেছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান জান্নাতুল নাঈম। তাঁর দাবি, আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, মিজানুর রহমান মিজানও একই আদালতে জান্নাতুল নাঈমের বিরুদ্ধে সিআর মামলা নম্বর ৮৩৪/২০২৬ দায়ের করেছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। মিজান তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে ঘটনাটিকে আর্থিক লেনদেনের বিরোধ এবং পরিকল্পিত মিথ্যা মামলা বলে দাবি করেছেন।
গত ১৩ অক্টোবর মিজানের আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যেরও বিরোধিতা করেন জান্নাতুল নাঈম। তাঁর দাবি, ওই বক্তব্যে ঘটনার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে জান্নাতুল নাঈম অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, কথিত ছিনিয়ে নেওয়া মালামাল উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।
মন্তব্য করুন