Hasan
২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৪৫ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

রাতজাগা ও সকালে ক্লান্তির সঙ্গে বিষণ্নতার নতুন ধরনের সম্পর্ক খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা?

রাতে দেরি করে ঘুমাতে যান। সকালে অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়েও ক্লান্তি কাটে না। আবার সপ্তাহের একেক দিন ঘুমানোর সময়ও একেক রকম। বিষণ্নতায় ভোগা অনেক মানুষেরই এমন অভিজ্ঞতা হয়। এত দিন ঘুমের এসব সমস্যাকে বিষণ্নতার লক্ষণ হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার একদল গবেষক বলছেন, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে শরীরের স্বাভাবিক ঘড়ির ছন্দে গোলমালই বিষণ্নতার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে

গবেষকেরা বিষণ্নতার সম্ভাব্য এই নতুন ধরনের নাম দিয়েছেন ‘সারকাডিয়ান ডিপ্রেশন’ বা শরীরের জৈবিক ঘড়ির সঙ্গে সম্পর্কিত বিষণ্নতা। তবে এটি এখনো চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বীকৃত আলাদা কোনো ধরন নয়।

শরীরের ঘড়ির সঙ্গে বিষণ্নতার সম্পর্ক কী

আমাদের শরীরে একটি স্বাভাবিক ঘড়ি আছে। এটি প্রায় ২৪ ঘণ্টার চক্রে কাজ করে। কখন ঘুম পাবে, কখন জেগে থাকতে ইচ্ছা করবে, শরীর কখন বেশি সক্রিয় থাকবে—এসব নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এই ঘড়ি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘সারকাডিয়ান রিদম’।

সূর্যের আলো এই ঘড়িকে ঠিক রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু নিয়মিত রাতজাগা, ঘুমের সময় বদলে যাওয়া কিংবা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমানোর মতো অভ্যাসের সঙ্গে শরীরের স্বাভাবিক ছন্দের অমিল তৈরি হতে পারে।

বিষণ্নতায় ভোগা মানুষের মধ্যে ঘুমের সমস্যা খুবই সাধারণ। তবে প্রশ্ন হলো, বিষণ্নতার কারণে কি ঘুমের সমস্যা হয়, নাকি ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে গোলমাল থেকে কারও কারও বিষণ্নতা তৈরি হতে পারে?

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দ্বিতীয় কারণটিও খতিয়ে দেখছেন।

 

 

ঘুমের ছয় বৈশিষ্ট্যের মধ্যে তিনটি

‘ব্রিটিশ জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি’তে প্রকাশিত গবেষণায় বিষণ্নতায় ভোগা ১১ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

গবেষকেরা ঘুম ও দৈনন্দিন জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত ছয়টি বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেন।

বছরের নির্দিষ্ট ঋতুতে বিষণ্নতার লক্ষণ বাড়া বা কমা।

স্বাভাবিকের চেয়ে দেরিতে ঘুমাতে যাওয়া।

রাত জেগে থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করা।

অতিরিক্ত ঘুমানো।

সকালে ঘুম থেকে উঠেও খুব ক্লান্ত লাগা।

কর্মদিবস ও ছুটির দিনে ঘুমানোর সময়ের মধ্যে বড় পার্থক্য থাকা।

শেষের বৈশিষ্ট্যটিকে বলা হয় ‘সোশ্যাল জেট ল্যাগ’। যেমন কেউ কর্মদিবসে সকাল ৭টায় ওঠেন, কিন্তু ছুটির দিনে ঘুম থেকে ওঠেন বেলা ১১টায়। নিয়মিত এমন পার্থক্য থাকলে শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণের ছন্দের সঙ্গে দৈনন্দিন রুটিনের অমিল তৈরি হতে পারে।

গবেষণায় যাঁদের মধ্যে ছয়টি বৈশিষ্ট্যের অন্তত তিনটি পাওয়া গেছে, তাঁদের সম্ভাব্য সারকাডিয়ান ডিপ্রেশন দলে রাখা হয়।

 

 

প্রতি চারজনের প্রায় একজন

গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২ হাজার ৬০৪ জন, অর্থাৎ প্রায় ২৩ শতাংশের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্যগুলো পাওয়া গেছে।

গবেষণায় দেখা যায়, অন্যদের তুলনায় এই দলের মানুষের বিষণ্নতা অপেক্ষাকৃত কম বয়সে শুরু হয়েছে। তাঁদের বিষণ্নতার লক্ষণও ছিল বেশি গুরুতর।

জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা আরও দেখেন, এই দলের মানুষের মধ্যে মনোযোগের ঘাটতি ও অতিসক্রিয়তাজনিত সমস্যা (এডিএইচডি), বাইপোলার ডিজঅর্ডার এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনগত ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

তবে এর অর্থ এই নয় যে তাঁদের সবার এসব রোগ আছে বা ভবিষ্যতে হবেই। গবেষণায় শুধু জিনগত ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

বিষণ্নতায় ভোগা মানুষের মধ্যে ঘুমের সমস্যা খুবই সাধারণ

গবেষণায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। সম্ভাব্য সারকাডিয়ান ডিপ্রেশন দলের অংশগ্রহণকারীরা জানিয়েছেন, প্রচলিত কিছু বিষণ্নতার ওষুধে তাঁরা তুলনামূলক কম উপকার পেয়েছেন। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার অভিজ্ঞতাও তাঁদের বেশি।

বিশেষ করে এসএসআরআই ও এসএনআরআই শ্রেণির অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধের ক্ষেত্রে এমন সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

গবেষণার অন্যতম লেখক সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যাকব ক্রাউসের মতে, বিষণ্নতা সবার ক্ষেত্রে এক রকম নয়। এর কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসায় সাড়াও ভিন্ন হতে পারে। তাই রোগীদের মধ্যে এসব পার্থক্য বোঝা জরুরি।

তবে গবেষণায় ওষুধ কতটা কাজ করেছে, তা মূলত অংশগ্রহণকারীদের নিজেদের দেওয়া তথ্য থেকে জানা হয়েছে। ফলে শুধু শরীরের জৈবিক ঘড়ির সমস্যার কারণেই ওষুধ কম কাজ করেছে, এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।

নতুন ধরনের বিষণ্নতা কি সত্যিই পাওয়া গেছে
এখানেই বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভিন্নতা আছে। গবেষকেরা মনে করছেন, শরীরের জৈবিক ঘড়ির সমস্যা বিষণ্নতার একটি আলাদা ধরন শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু অন্য বিশেষজ্ঞরা এখনই বিষয়টিকে স্বীকৃত নতুন ধরন হিসেবে দেখতে রাজি নন।

লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের মনোরোগ–বিশেষজ্ঞ ডেভিড কার্টিসের মতে, গবেষণায় চিহ্নিত বৈশিষ্ট্যগুলো হয়তো এমন ব্যক্তিদের আলাদা করেছে, যাঁদের বিষণ্নতা আগে থেকেই বেশি গুরুতর। সে কারণেও তাঁদের ঘুমের সমস্যা ও চিকিৎসায় কম সাড়া দেওয়ার প্রবণতা থাকতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক কলিন ম্যাকক্লাংও সতর্ক করেছেন, অংশগ্রহণকারীদের কারও কারও বাইপোলার ডিজঅর্ডার থাকতে পারে।

গবেষণাটির আরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। ঘুমের অভ্যাস সম্পর্কে তথ্য নেওয়া হয়েছে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকেই। শরীরে পরার বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে ঘুমের সময় বা মেলাটোনিন হরমোনের মাত্রা মেপে জৈবিক ঘড়ির সমস্যা নিশ্চিত করা হয়নি।

সবচেয়ে বড় কথা, এই গবেষণা থেকে বোঝা যায় না ঘুমের সমস্যার কারণে বিষণ্নতা হয়েছে, নাকি বিষণ্নতার কারণেই ঘুমের সমস্যা তৈরি হয়েছে।

 

 

 

যে ১০ ‘অজানা’ কারণে আপনি সব সময় হতাশা, বিষণ্নতা ও মানসিক চাপে ভোগেন
ঘুমের সময় ঠিক করলে কি বিষণ্নতা কমবে
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন গবেষকেরা। শরীরের জৈবিক ঘড়ির ছন্দ ঠিক রাখতে আলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই বিষণ্নতার চিকিৎসায় উজ্জ্বল আলো ব্যবহার করে ‘লাইট থেরাপি’ দেওয়া হয়।

২০২৫ সালের একটি গবেষণা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ঋতুভিত্তিক নয়, এমন বিষণ্নতায় ভোগা আট শতাধিক ব্যক্তির ওপর পরিচালিত বিভিন্ন পরীক্ষায় লাইট থেরাপি পাওয়া ব্যক্তিদের ৪০ শতাংশের বেশি মানুষের বিষণ্নতার উপসর্গ এতটাই কমেছে যে তাঁরা রোগমুক্তির নির্ধারিত মানদণ্ডে পৌঁছেছেন। তুলনায় নিয়ন্ত্রণ দলের প্রায় ২৫ শতাংশের ক্ষেত্রে এমন ফল পাওয়া গেছে।

তবে ওই গবেষণাগুলোয় বিশেষভাবে সারকাডিয়ান ডিপ্রেশনের সম্ভাব্য বৈশিষ্ট্যযুক্ত ব্যক্তিদের বেছে নেওয়া হয়নি। ফলে তাঁদের ক্ষেত্রে এই চিকিৎসা বেশি কার্যকর হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

শরীরের ঘুম-জাগরণের চক্র নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা মেলাটোনিন হরমোন নিয়েও গবেষণা চলছে। তবে বিষণ্নতার চিকিৎসায় মেলাটোনিন সেবনের উপকারিতা সম্পর্কে এখনো যথেষ্ট প্রমাণ নেই।

সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এখন পরীক্ষা করছেন, সম্ভাব্য সারকাডিয়ান ডিপ্রেশনের বৈশিষ্ট্য থাকা তরুণদের ক্ষেত্রে মেলাটোনিন কতটা কার্যকর।

 

 

রাত জাগার অভ্যাস থাকলেই কারও বিষণ্নতা আছে বা হবে, এমন নয়। আবার সকালে ক্লান্ত লাগা কিংবা ছুটির দিনে বেশি ঘুমানোর অর্থও বিষণ্নতা নয়।

গবেষণাটি মূলত বিষণ্নতায় ভোগা মানুষের মধ্যে ঘুমের কিছু বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে রোগের তীব্রতা ও চিকিৎসার সম্পর্ক খুঁজেছে। সাধারণ মানুষের বিষণ্নতা হওয়ার ঝুঁকি নির্ধারণ করেনি।

তবে নিয়মিত ঘুমের সমস্যা হলে, বিশেষ করে এর সঙ্গে দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকা, আগের পছন্দের কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা বা দৈনন্দিন কাজকর্মে সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

বিষণ্নতার চিকিৎসা চললে নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ করা কিংবা মেলাটোনিন বা লাইট থেরাপি শুরু করাও ঠিক নয়।

গবেষণাটি নতুন একটি সম্ভাবনার কথা বলছে। ভবিষ্যতে হয়তো ঘুমের ধরন বুঝে বিষণ্নতার চিকিৎসা আরও নির্দিষ্টভাবে দেওয়া সম্ভব হবে। তবে সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

 

Facebook Comments Box
১ম লাইন রঙ
২য় লাইন রঙ
ফন্ট সাইজ (65px)

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হতাশা কাটাতে ইসলামের পাচ আমল

১

ঢাকায় পাসের হার ৭৯%, মানিকগঞ্জে ৩৮%, এইচএসসির ফলে শহর-গ্রামে বড় বৈষম্য

২

রাতজাগা ও সকালে ক্লান্তির সঙ্গে বিষণ্নতার নতুন ধরনের সম্পর্ক খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা?

৩

সিলেটে তৌসিফ, সাফা ও টয়ার ঘোরাঘুরির গল্প

৪

নিরাপত্তা উদ্বেগের মধ্যে এএফসি চ্যাম্পিয়নস লিগের স্কোয়াডে নেই রোনালদো

৫

মিরপুরে বাংলাদেশের ব্যাটিং ধস, ৮ উইকেটের জয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের

৬

ইরানের পিকঅ্যাক্সে হামলার ইঙ্গিত ট্রাম্পের

৭

জেন-জি বিক্ষোভে উত্তাল জার্মানি

৮

দেশের বাজারে কমলো সোনার দাম

৯

নতুন পে স্কেলে বেতন

১০

গার্মেন্টসে অস্থিরতায় সীমান্তের ওপার থেকে ইন্ধন জোগাচ্ছে

১১

পোশাক কারখানা চালু রেখে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতের নির্দেশ প্রধান মন্ত্রীর

১২

বাকৃবির ভেটেরিনারি অনুষদের নতুন ডিন অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান

১৩

খালিয়াজুরীতে জলমহালে মাছ ধরায় জরিমানা

১৪

শ্যালকের স্ত্রীকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া দপ্তরীকে বরখাস্তের দাবিতে মানববন্ধন

১৫

নেত্রকোনায় শিশু জান্নাতুল হত্যা: তদন্ত স্থবির, আসামিদের ‘হুমকি’র মুখে পরিবার

১৬

স্বাবলম্বী যুবসমাজ গড়ার প্রত্যয়ে জাতীয় যুব দিবস উদযাপন

১৭

নেত্রকোনায় অক্টোবরে ১ কোটি ১৩ লাখ টাকার ভারতীয় চোরাই পণ্য জব্দ

১৮

নেত্রকোনায় ধানক্ষেত থেকে খণ্ডিত লাশ উদ্ধার

১৯

হোসেনপুরে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে অস্ত্রসহ আন্তঃজেলা ডাকাত চক্রের ৪ সদস্য গ্রেপ্তার

২০
শিরোনামঃ