‘প্রতিটি মানুষের কাছেই তার ভাষা গুরুত্বপূর্ণ। মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধস্বরূপ’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা, সংরক্ষণ ও বিকাশ বিষয়ক দিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বুধবার (১২ আগস্ট) আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের আয়োজনে বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি মিলনায়তনে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালার উদ্বোধন করেন নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আসাদুজ্জামানের সভাপতিত্বে কর্মশালায় স্বাগত বক্তব্য দেন প্রতিষ্ঠানটির অতিরিক্ত পরিচালক আবুল কালাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মুন মুন জাহান লিজা, দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহমেদ সাদাত এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমির পরিচালক অঞ্জন কুমার চিছাম।

কর্মশালায় প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লেখক ও গবেষক বাঁধন আরেং ও তর্পন ঘাগ্রা। এ ছাড়া সাংবাদিক, শিক্ষক, প্রভাষক, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আলোচনায় অংশ নেন।

কর্মশালায় বক্তারা বলেন, বাঙালির পাশাপাশি বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। তাঁদের প্রত্যেকের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনাচরণ রয়েছে। এসব ভাষা ও সংস্কৃতি শুধু একটি জনগোষ্ঠীর পরিচয়ের অংশ নয়, বরং দেশের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যেরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

বক্তারা জানান, বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষা হিসেবে প্রায় ৪০টি ভাষার স্বীকৃতি রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১৪টি ভাষা বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে। ভাষাগুলো বিভিন্ন ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে পাঁচটি দ্রাবিড়, ১৫টি চীনা-তিব্বতী, নয়টি অস্ট্রো-এশিয়াটিক এবং ১১টি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারভুক্ত বলে কর্মশালায় জানানো হয়।

বক্তারা আরও বলেন, একটি ভাষা হারিয়ে গেলে শুধু শব্দ বা কথোপকথনের একটি মাধ্যম হারায় না; এর সঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, লোকজ জ্ঞান, সংস্কৃতি, প্রথা ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই বিপন্ন ভাষাগুলো সংরক্ষণে গবেষণা, নথিভুক্তকরণ, প্রজন্মের মধ্যে ভাষার চর্চা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

তাঁরা বলেন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট বিভিন্ন ভাষা সংরক্ষণ ও গবেষণার উদ্যোগ নিয়েছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় সরকারের নেওয়া উদ্যোগের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণও জরুরি।

কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষার ব্যবহার, সংরক্ষণ, চর্চা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। একই সঙ্গে ভাষার পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি, লোকজ জ্ঞান ও নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।