ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার ঝালুয়া এলাকায় ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের পাশে অবস্থিত মাফরুহীন খান চৌধুরী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ছয় মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী নিয়ে এক দশক ধরে চলা বিদ্যালয়টি পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় বিদ্যালয়টির অবস্থান ৩৭ নম্বরে।
বিদ্যালয় ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সাবেক সংসদ সদস্য খুররম খান চৌধুরী তার মেয়ের নামে ৫০ শতক জমির ওপর বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠানটি সরকারি পাঠদানের অনুমতিসহ স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ছিল। এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়াও চলছিল বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান। ২০২১ সালের ১৭ জুলাই করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান প্রতিষ্ঠাতা খুররম খান চৌধুরী।
তাঁর মৃত্যুর পর বিদ্যালয়টিতে অচলাবস্থা তৈরি হয়। পরে প্রতিষ্ঠাতা খুররম খানের মেয়ে ও বিদ্যালয়ের পরিচালক মাফরুহীন চৌধুরী দায়িত্ব নেন। তার বিরুদ্ধে এমপিওভুক্ত করার প্রলোভন দেখিয়ে এবং নতুন শিক্ষক নিয়োগের কথা বলে কর্মরত শিক্ষক ও চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে অন্তত ৫০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা না দেওয়ায় একপর্যায়ে বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যায়।
বিদ্যালয়ের পাশের বাসিন্দা ও দুই শিক্ষিকা শিউলি আক্তার ও বিলকিস আক্তার বলেন, তাঁরা নিজেদের জমি বিক্রি করে বিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার সময় প্রায় ১২ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। এভাবে আরও পাঁচজন টাকা দিয়েছেন। কিন্তু গত ১০ বছরে তারা প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো বেতন-ভাতা পাননি।
ওই দুই শিক্ষিকার অভিযোগ, দীর্ঘদিন বিনা বেতনে কাজ করার পর এমপিওভুক্তির আশ্বাসে টাকা নেওয়া হলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। নতুন শিক্ষক নিয়োগের কথা বলে টাকা দেওয়া ব্যক্তিদের চাপের মুখে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাদিয়া আক্তারও সম্প্রতি এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে তারা জানান।
বিদ্যালয়ের পাশের বাসিন্দা ও অভিভাবক সোহেল মিয়া বলেন, ‘স্কুলটি ভালোই চলছিল। শিক্ষার্থীও ছিল অনেক। কিন্তু হঠাৎ করে এভাবে কেন বন্ধ হলো, তা এখনো বোধগম্য নয়। আমরা মনে করি, সঠিক তদন্ত করে প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় চালু করার ব্যবস্থা করা হোক।’
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটকে তালা ঝুলছে। অন্য পথ দিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, সব কক্ষেই তালা দেওয়া। শ্রেণিকক্ষের সামনে লম্বা ঘাস জন্মেছে।
এ সময় বিদ্যালয়ের দফতরি পরিচয় দেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা শহীদ বলেন, ‘এইহানো জীবনডাই শেষ করলাম। কুলুর বলদের মতো কাম কইর্যা গেলাম। কিন্তু আইজ কিছুই পাইলাম না। এমন একটা ইস্কুলও বন্ধ অইয়া যায়?’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাদিয়া আক্তার বলেন, বিদেশে অবস্থানরত বিদ্যালয়ের পরিচালক মাফরুহীন চৌধুরী শিক্ষক ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এমপিওভুক্ত হবে ও নতুন নিয়োগ দেওয়া হবে—এমন কথা বলে আমার কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়েছেন মাফরুহীন। এ কারণে পাওনাদারেরা আমার খোঁজ করেন। এ অবস্থায় আমি গা-ঢাকা দিয়েছি। আমার নামে দুটি মামলা হয়েছে। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।’
এ বিষয়ে নান্দাইল উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘এভাবে বিদ্যালয় বন্ধ হওয়া ঠিক নয়। ১০ বছর ধরে চলমান বিদ্যালয়টি কেন বন্ধ হলো, তা খোঁজ নেওয়া হবে। সেই সঙ্গে অচিরেই বিদ্যালয়টি চালু করার চেষ্টা করা হবে।’
|
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬