শেরপুরের নকলায় এক বীর মুক্তিযোদ্ধার সম্মানী ভাতার অংশ ও ওয়ারিশ সনদ নিয়ে পারিবারিক বিরোধ দেখা দিয়েছে। নিজের প্রাপ্য অংশ পাওয়ার দাবি জানিয়ে শেরপুরের আদালতে সাকসেশন মামলা করেছেন মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. হামিদা বেগম। তবে তাঁকে বিয়ে করার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন মুক্তিযোদ্ধার প্রথম স্ত্রী মোছা. মাজেদা খাতুন। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, যাচাই-বাছাই করেই ওয়ারিশ সনদ দেওয়া হয়েছে।
আদালতে দাখিল করা আবেদনপত্রের তথ্য অনুযায়ী, মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম নকলা উপজেলার বিবিরচর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। হামিদা বেগমের দাবি, ১৯৯৭ সালের ৯ জুলাই রেজিস্ট্রি কাবিননামার মাধ্যমে তাঁদের বিয়ে হয়। তাঁদের ঘরে ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি একটি পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। একই বছরের ১২ এপ্রিল সাইফুল ইসলাম মারা যান বলে আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
হামিদা বেগম অভিযোগ করেন, স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁকে ও তাঁর নবজাতক সন্তানকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে জীবিকা নির্বাহের জন্য ঢাকার পুরান পল্টন এলাকায় বিভিন্ন বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি শেরপুরে এসে বসবাস শুরু করেন।
হামিদা বেগমের ভাষ্য, মৃত মুক্তিযোদ্ধার মাসিক সম্মানী ভাতা ২০ হাজার টাকা। ভাতার অংশ পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করার পর ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে তাঁর ব্যাংক হিসাবে ১০ হাজার টাকা জমা হয়েছিল। তবে প্রথম স্ত্রীর আপত্তির কারণে পরবর্তী সময়ে ভাতার অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
হামিদা বেগম দাবি করেন, মৃত স্বামীর সম্মানী ভাতার অর্ধেক, অর্থাৎ মাসে ১০ হাজার টাকা তাঁর প্রাপ্য। এ অর্থ বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য প্রথম স্ত্রীকে অনুরোধ করেও সাড়া পাননি বলে জানান তিনি। তবে ভাতার অর্থে তাঁর আইনগত অধিকার ও প্রাপ্য অংশ কতটুকু, তা সংশ্লিষ্ট বিধি, নথিপত্র এবং আদালতের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
ওয়ারিশ সনদ নিয়ে বিরোধের বিষয়ে জানা যায়, নকলার টালকী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম বদিউজ্জামান বদি একটি ওয়ারিশ সনদে হামিদা বেগমের নাম উল্লেখ করেননি। তবে তাঁর ছেলে মো. সোহাগ মিয়াসহ প্রথম পক্ষের স্ত্রী-সন্তানদের মোট সাতজনের নাম ওই সনদে ছিল বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে।
পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালের ২০ জুন বর্তমান চেয়ারম্যান মোজাফ্ফর মহিউদ্দিন বুলবুলের দেওয়া ওয়ারিশ সনদে প্রথম স্ত্রী মোছা. মাজেদা খাতুনের সন্তানদের পাশাপাশি দ্বিতীয় স্ত্রী হামিদা বেগম ও তাঁর ছেলে মো. সোহাগ মিয়াসহ মোট আটজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
মৃত মুক্তিযোদ্ধার প্রথম পক্ষের বড় ছেলে মো. সোহেল রানা বলেন, ‘হামিদা বেগম আমার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী (সৎ মা) এবং সোহাগ মিয়া আমার সৎ ভাই। আমরা যেমন ওয়ারিশ, তারাও তেমন ওয়ারিশ। আমরা জমিজমা ভাগ করার সময় সোহাগের অংশ রেখেই ভাগ করেছি।’
অন্যদিকে, মৃত মুক্তিযোদ্ধার প্রথম স্ত্রী মোছা. মাজেদা খাতুন হামিদা বেগমের সঙ্গে তাঁর স্বামীর বিয়ের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম গানবাজনা পছন্দ করতেন। তাঁর একটি গানের দল ছিল। সেই সূত্রে তিনি তিনটি বিয়ে করেছিলেন। আমি প্রথম স্ত্রী। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্ত্রী তাঁকে তালাক দিয়ে চলে যান। হামিদা বেগমও আমাদের বাড়িতে থেকে আমার স্বামীর সঙ্গে গানের দলে কাজ করতেন। আমার স্বামী তাঁকে বিয়ে করেননি।’
মাজেদা খাতুন আরও অভিযোগ করেন, সরকারি ভাতার অর্থ নিয়ে বিরোধের জেরে হামিদা বেগম তাঁর বড় ছেলের সঙ্গে যোগসাজশ করে ভাতার অংশ পাওয়ার উদ্দেশ্যে ভুয়া কাবিননামা ও ওয়ারিশ সনদ তৈরি করে মামলা করেছেন। তবে তাঁর এ অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। কাবিননামার বৈধতা ও বিয়ের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নথি ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
নকলার টালকী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোজাফ্ফর মহিউদ্দিন বুলবুল বলেন, ‘হামিদা বেগম মুক্তিযোদ্ধা সাইফুলের দ্বিতীয় স্ত্রী। তাঁর একটি সন্তানও রয়েছে। এই তথ্য আমি অনেক আগে থেকেই জানি। অন্যের বাসায় কাজ করে এই মহিলা সংসার চালান। সব তথ্য যাচাই-বাছাই করেই আমি ওয়ারিশ সনদ দিয়েছি।’
এদিকে, নকলা উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আলহাজ মো. খোরশেদুর রহমান বলেন, ‘মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা সাইফুল ইসলাম আমার প্রতিবেশী। হামিদা বেগম তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী এবং ওই পক্ষের একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। আমিও চাই, অসহায় এই পরিবারটি তাদের অধিকার ফিরে পাক।’
মুক্তিযোদ্ধার দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে হামিদা বেগমের দাবি, কাবিননামার বৈধতা, ওয়ারিশ সনদ এবং সম্মানী ভাতার অর্থে তাঁর আইনগত অধিকার—এসব বিষয় এখন বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে। আদালতে দায়ের করা মামলার নথি, বিয়ের নিবন্ধনসংক্রান্ত দলিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রেকর্ড যাচাইয়ের মাধ্যমে বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি হতে পারে।
মন্তব্য করুন