Tawfik
১৮ অক্টোবর ২০২৬, ২:১৯ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

ফকির লালন সাঁই ধন্য ধন্য বলি তারে

লালন ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এক জন বাঙালি; যিনি ফকির লালন, লালন সাঁই, লালন শাহ, মহাত্মা লালন ইত্যাদি নামেও পরিচিত। তিনি একাধারে এক জন আধ্যাত্মিক ফকির সাধক, মানবতাবাদী, সমাজ সংস্কারক এবং দার্শনিক। তিনি ছিলেন অসংখ্য গানের গীতিকার, সুরকার ও গায়ক। লালনকে বাউল গানের অগ্রদূতদের অন্যতম এক জন হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং তার গান উনিশ শতকে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তিনি বিশ্বাস করতেন সব মানুষের হৃদয়ে বাস করে এক মনের মানুষ, আর মনের মানুষের কোনো জাত, ধর্ম, বর্ণ বা কুল থাকে না। মানুষের দৃশ্যমান শরীর আর অদৃশ্য এই মনের মানুষ সম্পূর্ণ আলাদা সত্ত্বা। তিনি মনের অন্তরালের এই সত্ত্বাকে তুলনা করেছেন এক অচিন পাখির সঙ্গে, যা খাচারূপী দেহের ভিতর অনায়াসে আসা-যাওয়া করে- কিন্তু একে বন্দি করা যায় না। দার্শনিক এই সাধক ছিলেন বাউল গানের অগ্রদূত বাউল সম্রাট নামে খ্যাত লালন শাহ্। তিনি লালন ফকির বা লালন সাঁই নামেও পরিচিত। শিষ্যরা তাকে ‘শাহ’ নামে ডাকে। মোহন দাস করমচাদ গান্ধীর প্রায় ২৫ বছর আগে তাকে ইনডিয়ান মহাদেশে প্রথম ‘মহাত্মা’ উপাধি দেয়া হয়।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী লালন ছিলেন একাধারে বাউল সাধক, সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক এবং মানবতাবাদী। অসংখ্য গানের গায়ক, গীতিকার এবং সুরকার। তৎকালীন সময়ে মানুষের নিপীড়ন, জাতিভেদ, ধর্মীয় গোড়ামি, কুসংস্কার, আত্মকেন্দ্রিকতা সমাজ জীবনে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাড়িয়েছিল। সমাজের সেসব কুসংস্কারকে তিনি বিভিন্ন আঙ্গিকে তার গানের মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছিলেন। যে কারণে লালনের সঙ্গীতে আকৃষ্ট হয়েছিলেন বহু ঐতিহাসিক, সম্পাদক, বুদ্ধিজীবী, লেখক, সর্বোপরি গ্রামের সাধারণ মানুষও। তিনি তার গানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ ভেদে মানবতাকেই সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছেন। অসাম্প্রদায়িক মনোভাবই ছিল তার রচনার মূলমন্ত্র। তার রচিত গান যুগে যুগে প্রভাবিত করেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও এলেন গিন্সবার্গের মতো বহু খ্যাতনামা কবিকেও।

জন্ম, বেড়ে ওঠা ও সংসার
লালন সাঁইয়ের বাল্য জীবন সম্পর্কে খুব স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। তবে তার স্বরচিত অসংখ্য গানে আর কিছু তথ্যসূত্রের মাধ্যমে তার জীবনী সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তথ্যসূত্র অনুযায়ী, ১৭৭৪ সালে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ড উপজেলার অন্তর্ভুক্ত হারিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আবার কিছু লালন বিশেষজ্ঞের মতে, তিনি কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানার ভাড়ারা গ্রামে জন্মেছিলেন। বাবা শ্রী মাধব কর আর মা শ্রীমতী পদ্মাবতীর সংসারের একমাত্র সন্তান তিনি, প্রকৃত নাম লালন চন্দ্র কর। শৈশবেই বাবাকে হারান তিনি। ফলে অল্প বয়সেই লেখাপড়া ছেড়ে সংসারের হাল ধরতে হয় তাকে। মাতৃভক্ত লালন মায়ের সেবার উদ্দেশ্যে বিশাখাকে বিয়ে করে সংসারে মনোনিবেশ করেন। ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি অনুরাগী ছিলেন তিনি। গ্রামে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন পালাগান, কবিগান বা কীর্তনে তার গান শুনে মুগ্ধ হতো মানুষ।

পুণ্য লাভের উদ্দেশ্যে তরুণ বয়সে প্রতিবেশী ও সঙ্গীসাথী নিয়ে তীর্থ ভ্রমণে বের হন তিনি। পথিমধ্যে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন। অসুখের তীব্রতা বাড়লে সেখানেই অজ্ঞান হয়ে যান তিনি। তার সাথীরা তাকে মৃত ভেবে নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে ফিরে আসে। মৃত্যুর খবরে মা ও স্ত্রী মুষড়ে পড়ে। পরবর্তীতে সমাজের চাপে, রীতি অনুযায়ী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করতে বাধ্য হন তারা।

প্রথম মৃত্যু দ্বিতীয় জন্মের আগে
নদীর জলে ভেসে ভেলা অপর পাড়ে পৌছালে এক মুসলিম নারী, মতিজান তার হৃদস্পন্দন আছে দেখে তাকে বাড়ি নিয়ে যান। সেখানেই মতিজান ও তার স্বামী মলম শাহের শুশ্রƒষার ফলে নতুন জীবন ফিরে পায় লালন। দুর্ভাগ্যবশত গুটিবসন্ত রোগে এক চোখ হারান তিনি। সুস্থ হয়ে নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। তার অপ্রত্যাশিত আগমনে স্ত্রী ও মায়ের হৃদয় আনন্দে আপ্লুত হয়ে উঠে। কিন্তু সেই আনন্দ কিছুক্ষণের মাঝেই হাহাকারে পরিণত হয়। তার ফিরে আসার সংবাদে গ্রামের মানুষ তাকে দেখতে ছুটে আসে। সমাজপতিরা তাকে জীবিত মেনে নিতে অস্বীকার জানায়। মুসলিম ঘরে জলপান করায় বিচ্যুত করা হয় পরিবার তথা সমাজ থেকে। জাতি, ধর্মের দোহাই দিয়ে তাকে মাতৃভূমি ত্যাগ করতে হয়, যা তিনি সহ্য করতে পারেননি। স্ত্রীকে সঙ্গে নিতে চাইলে সমাজের শাসন আর ধর্মের বেড়াজাল ভেদ করে যাওয়ার মনোবল জড়ো করতে পারেননি বিশাখা। লালন চলে যাওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই শোকে মারা যান তিনি।

ঘর-বাড়ি, পরিবার ছেড়ে, সমাজের উচু-নিচু জাত প্রথার প্রতি বিতৃষ্ণা যেন নতুন এক লালনের জন্ম দেয়। পরিচয় ঘটে এক জন মরমী সাধক সিরাজ সাঁইয়ের সঙ্গে। তার সান্নিধ্যে লালনের আধ্যাত্মিক চেতনার বিকাশ ঘটে। সিরাজ সাঁইকে গুরু মেনে তিনি লালন থেকে হয়ে উঠলেন লালন সাঁই। এই জাত ধর্ম নিয়ে তার আক্ষেপ থেকে সৃষ্ট গান-
‘জাত গেল জাত গেল বলে
একি আজব কারখানা
সত্য কাজে কেউ নয় রাজি
সবই দেখি তা না না না
আসবার কালে কি জাত ছিলে?
এসে তুমি কি জাত নিলে?
কি জাত হবে যাবার কালে?
সে কথা ভেবে বলো না…’

ছেউড়িয়ার লালন
গুরুর নির্দেশে কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার ছেউড়িয়া গ্রামে কালীগাঙ্গ নদীর পাড়ে ঘন জঙ্গলে আম গাছের নিচে তপস্যা শুরু করেন। ধীরে ধীরে তার তপস্যার খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামে তখন কারিগর সম্প্রদায়ের বাস ছিল। তারাই অনুমতি নিয়ে গুরুর জন্য সেখানে আখড়া তৈরি করে দেয়। আধ্যাত্মিক সাধনার সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে হিন্দু-মুসলিম পরিশেষে সর্বস্তরের মানুষ তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে শুরু করে। শিষ্যদের নিয়ে যশোর, ফরিদপুর, পাবনা, রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় তিনি গানের মাধ্যমে তার মতবাদ প্রচার শুরু করেন। তার আসম্প্রদায়িক মনোভাব, সমাজের লৌকিকতার বিরুদ্ধে রচিত গান সাধারণ মানুষের মন জয় করে। জীবনের বাকি সময় তিনি সেখানেই কাটিয়ে দেন।

মাতৃভক্ত লালন তার সব সাধনার মধ্যেও মায়ের স্থান হৃদয়ে রেখে কাজ করে গেছেন। মায়ের মৃত্যু সংবাদে তিনি প্রয়োজনীয় সবকিছুর জোগাড় নিজ আখড়া থেকেই পাঠিয়ে দেন, যদিও সমাজের রীতিনীতির বাধ অতিক্রম করে তিনি সেখানে উপস্থিত হতে পারেননি।

মতাদর্শ প্রচার করতে গিয়ে লালন ও তার শিষ্যেরা পদে পদে পদদলিত হয়েছেন। কোথাও কোথাও বাউলদের চুল কেটে অথবা হাতের একতারা ভেঙে তাদের বাধা দিয়ে গেছেন তাদের অসম্প্রদায়িক মনোভাবে ক্ষিপ্ত ব্যক্তিরা। কিন্তু এত বাধা তাদের একচুলও বিচ্যুত করতে পারেনি মতাদর্শ থেকে। লালনের মৃত্যুর পরও মলম শাহ্রে দেয়া ১৬ বিঘা জমি নিলামে উঠলে, ইসমাইল শাহ্ সেটা কিনে শাহ্র শেষ স্মৃতি রক্ষা করেন। এভাবে শাহ্র ভক্তরা যুগে যুগে তার মতাদর্শ এবং দেখিয়ে দেয়া পথ অনুসরণ করে তাকে হৃদয়ের মণিকোঠায় বাচিয়ে রেখেছেন।

লালন ও তার সমসাময়িকরা
‘গ্রাম বাংলা’ পত্রিকার সম্পাদক কাঙাল হরিনাথ একবার জমিদারের অত্যাচারের বর্ণনা পত্রিকায় তুলে ধরলে জমিদারের লাঠিয়াল বাহিনী তাকে মারতে তেড়ে আসে। তখন বাউল লালন সাঁই তার শিষ্যদের নিয়ে তাদের প্রতিহত করে কাঙাল হারিনাথকে রক্ষা করেন। হারিনাথের মাধ্যমে লালনের পরিচয় ঘটে বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের সঙ্গে।

অনেক লালন গবেষকদের মতে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গেও তার পরিচয় ছিল এমন তথ্য পাওয়া যায়, কিন্তু সেটা সঠিক নয়। তবে লালনের মৃত্যুর আগে রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই জ্যোতিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে দেখা হয় এবং তিনিই একমাত্র লালন শাহ্’র জীবিত অবস্থার ছবি আকেন, তবে ভক্তদের মতে সে ছবি লালনের প্রকৃত মুখ ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়নি।

লালন ও তার গান
লালন সাঁই সাধক পুরুষ হলেও তিনি সংসার বিরাগী ছিলেন না। পিয়ারী নামে তার এক পালিত কন্যা ছিল এবং মৃত্যুর পূর্বে ভোলাই শাহ্ নামক ব্যক্তির সঙ্গে তার বিবাহ দেন তিনি। এ ছাড়া তার নির্দেশে আখড়ায় সাধকদের সাধক সঙ্গিনীও থাকত।

লালন রচিত গানের কোনো লিখিত রূপ ছিল না তাই সঠিক সংখ্যা অনুমান সম্ভব হয়নি। তিনি হঠাৎ করেই মুখে মুখে গান বেধে গাইতে শুরু করতেন। ‘পোনা মাছের ঝাক এসেছে’ বললেই ভক্তেরা একতারা আর ডুগডুগি হাতে বাদ্য বাজান শুরু করত। ভক্তদের হিসেবে তার রচিত গানের সংখ্যা আনুমানিক ১০ হাজারের মতো। পরবর্তীতে মানিক শাহ্ ও মনিরুদ্দিন শাহ্, শাহ্র গান খাতায় লিখে সংগ্রহ শুরু করেন। ফলে সেসব গান বাংলার মানুষের কাছে পৌছানো সম্ভব হয়েছে।

লালন তিরোধান
মৃত্যুর প্রায় এক মাস আগে থেকে তিনি পেটের সমস্যা ও হাত পায়ের গ্রন্থির সমস্যায় ভুগছিলেন। অসুস্থ অবস্থায় দুধ ছাড়া অন্য কিছু খেতেন না। এ সময় তিনি মাছ খেতে চাইতেন।

১৭ অক্টোবর ১৮৮০ (১ কার্তিক ১২৯৭) নিজ আখড়ায় সারা রাত শিষ্যদের নিয়ে গান বাজনা করে ‘আমি চলিলাম’ বলে তিনি আসর থেকে বিদায় নেন। তার কিছুক্ষণ পর সত্যিই তার সব শিষ্যদের কাদিয়ে ১১৬ বছর বয়সে বাংলার বাউল সম্রাট সাধক লালন সাঁই দেহত্যাগ করেন।

তিনি নিজেকে কখনো হিন্দু বা মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেননি। তিনি মানুষে বিশ্বাস করতেন। জীবদ্দশায় হিন্দু-মুসলিম যে কোনো রীতি পালনে তিনি অনিচ্ছা প্রকাশ করতেন। তাই মৃত্যুর পর তার ইচ্ছা অনুযায়ী তার আখড়ার একটি ঘরে তাকে সমাধিস্থ করা হয়। মৃত্যুর ১২ দিন পর কথাসাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন সম্পাদিত পত্রিকা ‘হিতকরী’তে রাইচরণ নামক লেখকের লিখিত একটি রচনায় তাকে ‘মহাত্মা’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। উপমহাদেশে প্রথম ‘মহাত্মা’ উপাধিতে ভূষিত লালন সাঁই।

লালন সাঁইয়ের মৃত্যুর দুই বছর পর রবীন্দ্রনাথ তার আখড়ায় যান, সেখানে তিনি তার দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে লালনকে নিয়ে প্রায় ১৫০টির মতো গান রচনা করেন। আমেরিকান কবি এলেন গিন্সবার্গ তার উদ্দেশ্যে রচনা করেন ‘অভঃবৎ খধষড়হ’ কবিতা। ১৯৬৩ সালে তার আখড়ায় ‘লালন লোকসাহিত্য কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৮ সালে তা পরিবর্তিত হয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘লালন একাডেমি’। বর্তমানে তার গান লালনগীতি বা লালন সংগীত নামে দেশ বিদেশ সর্বত্র সমাদৃত হয়।
‘খাচার ভিতর অচিন পাখি
কেমনে আসে যায়,
তারে ধরতে পারলে মনবেড়ি
দিতাম পাখির পায়…’

রবীন্দ্রনাথের ওপর লালনের প্রভাব
বাউল দর্শন ও সংগীত বাংলার অনেক কৃতী মানুষদেরই আকৃষ্ট করেছে। তবে রবীন্দ্রনাথ বাউল দর্শনের উঠোনে বিচরণ করেননি শুধু, এর অন্তপুরে প্রবেশ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, কবিতায় বাউলের প্রসঙ্গ ও বাউল দর্শন নানাভাবে এসেছে। যেমন তার ‘অভিসার’ কবিতাটির কথাই ধরা যায়। ‘আজি রজনীতে হয়েছে সময়, এসেছি বাসবদত্তা!’- প্রাণের গভীরে গিয়ে আঘাত করে সে কবিতার মর্মবাণী।

লালনের ‘মনের মানুষ’কে রবীন্দ্রনাথ নিজেও খুজেছেন তার নিজের মনোভূবনে। ক্রমশ তিনি রূপান্তরিত হয়েছেন রবীন্দ্র বাউলে। বাউল গানের সুর, বাণী ও তত্ত্বকথা তাকে যেমন আকৃষ্ট করেছে, তেমনি তিনি প্রভাবিত হয়েছেন বাউলের বেশভূষায়। বাউলের আলখাল্লা রবীন্দ্রনাথের প্রতীক হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্র মানসে বাউল প্রভাবের মূলে রয়েছে তার ব্যক্তিগত লালন চর্চা ও লালন শিষ্য সম্প্রদায়ের সাহচর্য।

জমিদারি পরিচালনার সূত্রে শিলাইদহ এসে রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন বাউল-ফকির ও বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীর সংস্পর্শে আসেন। এখানেই বাউল তত্ত্বের সঙ্গে তার অন্তরঙ্গ পরিচয় ঘটে। তিনি লিখেছেন-
‘কতদিন দেখেছি ওদের সাধককে
একলা প্রভাতের রৌদ্রে সেই পদ্মা নদীর ধারে,
যে নদীর নেই কোনো দ্বিধা পাকা দেউলের পুরাতন ভিত ভেঙে ফেলতে।
দেখেছি একতারা হাতে চলেছে গানের ধারা বেয়ে
মনের মানুষকে সন্ধান করবার গভীর নির্জন পথে।’
রবীন্দ্রনাথ প্রথম লালনের গানের উল্লেখ করেন ‘প্রবাসী’ পত্রিকার ভাদ্র ১৩১৪ সংখ্যায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত তার গোরা উপন্যাসে-
‘আলখাল্লা পরা এক বাউল নিকটে দোকানের সামনে দাড়াইয়া গান গাহিতে লাগিল :
খাচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়
ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতাম পাখির পায়।’
একই গানের উদ্ধৃতি মেলে রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’ গ্রন্থের ‘গান সম্বন্ধে প্রবন্ধ’ অধ্যায়ে।
‘দেখিলাম, বাউলের গানেও ঠিক ওই একই কথা বলিতেছে। মাঝে মাঝে বন্ধ খাচার মধ্যে আসিয়া অচিন পাখি বন্ধনহীন অচেনার কথা বলিয়া যায়; মন তাহাকে চিরন্তন করিয়া ধরিয়া রাখিতে চায়, কিন্তু পারে না। এই অচিন পাখির যাওয়া আসার খবর গানের সুর ছাড়া আর কে দিতে পারে!’

লালনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেখা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে সংশয় রয়েছে। নিশ্চিত কোনো খবর এ বিষয়ে পাওয়া যায় না। তবে লালনের শিষ্যদের অনেকের সঙ্গে যে রবীন্দ্রনাথের অনেকবার দেখা ও কথা হয়েছে, সে বিষয়ে অনেক ঐতিহাসিক দলিল রয়েছে। শিলাইদহে অবস্থানকালে তিনি লালনের গান সংগ্রহের উদ্যোগ নেন। জানা যায়, ছেউড়িয়ার আখড়া থেকে লালনের গানের খাতা আনিয়ে ঠাকুর এস্টেটের কর্মচারি বামাচরণ ভট্টাচার্যকে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ২৯৮টি গান কপি করিয়ে নেন। এই খাতা সম্পর্কে সনৎকুমার মিত্র বলেছেন, ‘রবীন্দ্র ভবনের খাতা দুটিই ছেউড়িয়ার আশ্রমের আসল খাতা এবং যেভাবেই হোক তা রবিবাবুর হাতে পৌছানোর পর আর আখড়ায় ফিরে আসেনি।’

লালনগীতির সংগ্রাহক মতিলাল দাশকে লালন শিষ্য ভোলাই শাহ্ বলেছিলেন, ‘রবিঠাকুর আমার গুরুর গান খুব ভালোবাসিতেন, আমাদের খাতা তিনি নিয়া গিয়াছেন, সে খাতা আর পাই নাই, কলিকাতা ও বোলপুরে চিঠি দিয়াও কোনো উত্তর পাই নাই।’
কবিগুরুর জগতে লালন যে কতটা প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, তা বুঝতে এর বেশি জানার প্রয়োজন পড়ে না।

Facebook Comments Box
১ম লাইন রঙ
২য় লাইন রঙ
ফন্ট সাইজ (65px)

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ভালুকায় মশক নিধন অভিযান

১

শেরপুর সীমান্তে এক লাখ ৩৮ হাজার টাকার ভারতীয় মাদক জব্দ

২

ফকির লালন সাঁই ধন্য ধন্য বলি তারে

৩

দেশের বাজারে যে দামে বিক্রি হচ্ছে সোনা

৪

সীমান্তে ৩৫ বিজিবির অভিযানে ১৩৫ বোতল ভারতীয় মদ উদ্ধার

৫

জিয়ানগরে প্রধান মন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের অর্থ বিতরণ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্যান উপহার

৬

‘হিন্দু-মুসলমান আমরা সবাই মানুষ, সবার উপর মানুষ সত্য’

৭

বাংলাদেশ শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা সুদৃঢ় করতে চায় যাযাদি অনলাইন

৮

এক বছর আগেই হত্যার আশঙ্কা নিয়ে পুলিশকে যা জানিয়েছিলেন সাংবাদিক আলিফ

৯

যুবদল নেতার ছেলেকে অপহরণ করে সাড়ে ৩ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ

১০

নেত্রকোণায় সাংবাদিক আলিফকে গুলি করে হত্যা, মামলা দায়ের

১১

বসুন্ধরা গ্রুপের সেলাই মেশিনে পরিবারের ভাগ্য বদলাতে চান ১০০ নারী

১২

নেত্রকোনায় গুলিতে নিহত সাংবাদিকের দাফন সম্পন্ন

১৩

সৎ মেয়েকে ধর্ষণ মামলায় জেল খেটে বেরিয়ে স্ত্রীকে কুপিয়ে হাত বিচ্ছিন্ন

১৪

দুর্গাপুরে সাংবাদিক হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন

১৫

ময়মনসিংহে জাল নোটসহ চারজন গ্রেপ্তার

১৬

পাঁচ মাস পর নদী থেকে নিখোঁজ যুবকের কঙ্কাল উদ্ধার

১৭

নালিতাবাড়ীতে খাল থেকে নিখোঁজ নারীর মরদেহ উদ্ধার

১৮

ফুলপুরে সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন

১৯

ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ছাত্রদল নেতাকে সাময়িক অব্যাহতি

২০
শিরোনামঃ
❮ভালুকায় মশক নিধন অভিযান❮শেরপুর সীমান্তে এক লাখ ৩৮ হাজার টাকার ভারতীয় মাদক জব্দ❮ফকির লালন সাঁই ধন্য ধন্য বলি তারে❮দেশের বাজারে যে দামে বিক্রি হচ্ছে সোনা❮সীমান্তে ৩৫ বিজিবির অভিযানে ১৩৫ বোতল ভারতীয় মদ উদ্ধার❮জিয়ানগরে প্রধান মন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের অর্থ বিতরণ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্যান উপহার❮‘হিন্দু-মুসলমান আমরা সবাই মানুষ, সবার উপর মানুষ সত্য’❮বাংলাদেশ শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা সুদৃঢ় করতে চায় যাযাদি অনলাইন❮এক বছর আগেই হত্যার আশঙ্কা নিয়ে পুলিশকে যা জানিয়েছিলেন সাংবাদিক আলিফ❮যুবদল নেতার ছেলেকে অপহরণ করে সাড়ে ৩ কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ